‘সওয়াবের আশায়’ মাত্র ১০ হাজার টাকায় চার রুম ভাড়া দেন বাড়িওয়ালা
গত শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি মাদ্রাসায় বিকট শব্দে এক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও চারটি ককটেল সাদৃশ্য বস্তু উদ্ধার করে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় তিন নারীসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মাদ্রাসার মালিক ও পরিচালক শেখ আল আমিন ওরফে বোমারু আল আমিন পলাতক রয়েছেন। তার নামে বিভিন্ন থানায় অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, গতকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত মাদ্রাসা পরিষ্কারের সময় ফের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে রাজু নামের এক শ্রমিক আহত হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর আগে আশপাশের উৎসুক জনতা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও এদিন আনাগোনা কম ছিল। ঘটনাস্থল সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ফিতা দিয়ে বেষ্টনী দিয়ে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মালিক পারভীন বেগম জানান, ২০২২ সালের শেষের দিকে হারুনুর রশীদ নামে এক ব্যক্তিকে ভাড়া দেন তিনি। যদিও তিনি প্রথমে ভাড়া দিতে রাজি হননি। পরে হারুনুর রশীদ তাকে বলেন, এখানে আমার বড় বোন (আল আমিনের স্ত্রী) ও ভগ্নিপতি (আল আমিন) থাকবে এবং শিশুদের আরবি শিক্ষা দেবে। এতে আপনাদের সওয়াব হবে। সওয়াবের আশায় তিনি মাত্র ১০ হাজার টাকায় তাদের রুম ভাড়া দেন। ওই সময় হারুনুর রশিদের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে মৌখিক চুক্তিতে ভাড়া দেন তিনি। পরে আল আমিন ও তার স্ত্রী মাদ্রাসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন।
বিস্ফোরণের এ ঘটনার পর তার মাথায় হাত ভবনের মালিক পারভীন বেগমের। নতুন করে ভবন নির্মাণের আর সামর্থ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, দাদার সম্পদ থেকে তার বাবার ভাগে পাওয়া এক টুকরো জায়গাতে সবার সহায়তায় ৪ রুমের একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এখন সবশেষ হয়ে গেছে।
তার একমাত্র মেয়ে সোহানা আক্তার। তিনি ফজলুল হক মহিলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণির পাঠদান শেষে টাকার অভাবে আর পড়ালেখা করতে পারেননি। জন্ম নেয়ার ৬ মাস বয়সেই ২০০৩ সালে বাবাকে হারান সোহানা। মা পারভিন বেগম আর বিয়ে না করে তাকে নিয়েই কষ্টে দিন যাপন করছেন।
জানা যায়, কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের ওই এলাকায় দাদার সম্পদ থেকে সোহানার বাবা গোলাম হোসেনের ভাগে এক টুকরো জায়গা পান। সেই জায়গাতে থাকার জন্য চাচা ও মামা দায়িত্ব নিয়ে খালা ও ফুপুর সহায়তায় সবাই মিলে ৪ রুমের একতলা ভবন নির্মাণ করে দেন।
২০২২ সালের শেষের দিকে সেই নির্মাণাধীন ভবনে কাজ চলাকালীন পরিচয় হয় উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় পরিচালক হারুনুর রশীদের সাথে। হারুন প্রস্তাব রাখেন, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করতে মাদ্রাসামুখী হতে। সেই কাজে সহায়তা করতে তার নির্মাণাধীন ভবন থেকে তিনটি রুম মাদ্রাসা কক্ষের জন্য ভাড়া চান পারভীন বেগমের কাছ থেকে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মালিক পারভীন বেগম বলেন, ২০২২ সালের প্রথম দিকে একতলা নির্মাণ করার পর অর্থের অভাবে নির্মাণকাজ থেমে যায়। পরে ওই বছর হারুনুর রশীদ নামের ঐ ব্যক্তি তার কাছে বাসাভাড়া নেওয়ার জন্য আসেন। তিনি প্রথমে ভাড়া দিতে রাজি হননি। পরে হারুনুর রশীদ তাকে বলেন, এখানে আমার বোন ও ভগ্নিপতি থাকবে এবং শিশুদের আরবি শিক্ষা দেবে। এতে আপনাদের সওয়াব হবে।
তিনি বলেন, সওয়াবের আশায় মাত্র ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় তাদের রুম দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে এক মাসের ভাড়া অগ্রিম নেওয়া হয়। ওই সময় হারুনুর রশিদের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে মৌখিক চুক্তিতে ভাড়া দেন।
প্রথমে তিন রুম নিয়ে উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মহিলা মাদ্রাসায় শুরু করে হারুনুর রশীদ। পরে ছাত্রের জায়গা না হওয়ায় পুরো বাড়ি ভাড়া চাইলে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে হারুনকে বাড়ি ভাড়া দিয়ে আর্সিন গেটস্থ ভাড়া বাড়িতে চলে যান পারভীন। এরপর থেকে প্রতি মাসে ভাড়া নিতে আসতেন পারভীন। কিন্তু সেই বাড়িতে আর থাকা হয়নি তাদের। ভেতরে কক্ষে প্রবেশ না করায় কী করতো জানতেন না তারা।
পারভীন বেগমের মেয়ে সোহানার আকুতি, আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে দেখি বিস্ফোরণে আমাদের ঘর ভেঙে একাকার। আমার বাবা মাড়া গেছে ছোট সময়। সকলে মিলে আমাদের এই ঘর তুলে দেয়। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই। সবার কাছে আকুল আবেদন, আমাদের এই ঘর নির্মাণের আর সামর্থ্য নেই। সরকারসহ সকলের সহায়তা কামনা করছি।
গত ২৬ ডিসেম্বর সকালে এই মাদ্রাসায় প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ ও বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত শেখ আল আমিন ওরফে বোমারু আল আমিন। এই আল আমিন ছিল আওয়ামী লীগের ‘জঙ্গি পুতুল”।
জানা গেছে, জঙ্গিবাদের নামে উলামায়ে কেরাম ও বিরোধীদের মত দমন করতে বোমারু আল আমিনকে ব্যবহার করা হতো। সৃষ্টির নেপথ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস।
আল আমিনের বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। তিনি ও তার পরিবার আওয়ামী লীগ সমর্থক। বোমা বানাতে এক্সপার্ট হওয়ায় তার নাম হয়ে যায় বোমারু আল আমিন। এই নামের কারণে তাকে সিলেক্ট করা হয় জঙ্গি নাটকের প্রধান চরিত্র হিসেবে।
বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে যখন প্রয়োজন পড়ত তখন আল আমিনকে ব্যবহার করা হতো। জঙ্গিবাদের নামে নাটক সাজিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হতো। সঙ্গে মামলায় শত শত উলামায়ে কেরাম ও বিরোধী মতের নাম জড়িয়ে দেওয়া হতো। চলত ধরপাকড়সহ নানা নির্যাতন।
কিছুদিন পর শেখ পরিবারের তাপসের সহায়তায় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসত আল আমিন। আবার যখন প্রয়োজন পড়ত একই নাটক সাজানো হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা হয়। এর মধ্যে চারটি সন্ত্রাস বিরোধী আইনে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আল আমিন চার কক্ষের ওই মাদ্রাসা চালিয়ে যে টাকা পেতেন তা দিয়ে ভাড়াও পরিশোধ করা সম্ভব হতো না। অথচ তিনি সব সময় বিলাসী জীবনযাপন করতেন। প্রাইভেটকারে চলাফেরা করতেন।
স্থানীয়রা বলছেন, ২৫-৩০টি শিশু তিনবেলা এসে এখানে আরবি পড়ত, যাদের বয়স ১০-১১ বছরের মধ্যে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে এ ভবনে কোনো কার্যক্রম ছিল না। ঘটনার সময় মাদ্রাসা ছুটি থাকায় বাচ্চারা রক্ষা পেয়েছেন।
জানা গেছে, একতলা একটি ভবনের চারটি কক্ষের মধ্যে দুটি কক্ষে শিশুদের পড়ানো হতো। বাকি ১টি কক্ষে আল আমিন স্ত্রী ও ৩ সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। অপর কক্ষে সে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম মজুত করেছিল। সেখান থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক ভর্তি কয়েকটি ড্রাম, চারটি ককটেল, সদৃশ বস্তু, একটি ল্যাপটপ ও দুটি মনিটার উদ্ধার করা হয়।
বিস্ফোরণে মাদ্রাসার দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে গেছে। ছাদ ও বিমে ফাটল ধরেছে। ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণে পাশের একটি আবাসিক ভবনের নিচ তলার দেয়ালে ফাটল ধরে। বিস্ফোরণের ঘটনায় গত শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে থানায় মামলা করেন। এজাহারে আল আমিনকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ৬/৭ জনকে আসামি করে মামলা করেছে।
আসামিদের মধ্যে ৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারা হলেন মাদ্রাসার পরিচালক আল আমিনের স্ত্রী আছিয়া বেগম, আছিয়ার বড় ভাইয়ের স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার (৩০) ও আসমানি খাতুন ওরফে আসমা (২৪), শাহিন ওরফে আবু বকর ওরফে মুসা ওরফে ডিবা সুলতান (৩২), মো. আমিনুর ওরফে দরজি আমিন (৫০) ও মো. শাফিয়ার রহমান ফকির (৩৬)। ঘটনার পরপরই শেখ আল আমিন পালিয়ে যায়।