০১ অক্টোবর ২০২৩, ২২:২৯

১ অক্টোবর ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা দিবস

দেশের প্রথম সারির কিছু আলিয়া মাদ্রাসা  © টিডিসি ফটো

আজ ১ অক্টোবর, ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা দিবস। পলাশীর ঐতিহাসিক যুদ্ধের পর অস্তমিত হতে যাওয়া ইসলামী শিক্ষার সুমহান ঝান্ডা উড্ডিন রাখতে তৎকালীন মুসলিম মনীষীদের প্রচেষ্টায় ফোর্ট উইলিয়ামের গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের তত্ত্বাবধায়নে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মাদ্রাসা-ই-আলিয়া।

১৭৮০ সনের এই দিনে আজকের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ধারার গোড়াপত্তন হয়। পাক-ভারত উপমহাদেশে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ধারার ইতিহাস বহু পুরনো। কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালুরও প্রায় একশ বছর আগে আলিয়া নেসাবের মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা হয়।

১৭৮০ সনের ১ অক্টোবর কলকাতা শহরের বৈঠকখানা রোডের বাড়িতে শুরু হওয়া শিক্ষাই আজকের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা। বাংলাদেশে প্রথম মাদ্রাসা শিক্ষা দিবস পালিত হয় ১৯৯৬ সনে। আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ধারার ইতিহাস বড়ই সোনালী। ১৭৮০ সনে কুরআন-হাদীসের শিক্ষা প্রায় বিলুপ্ত হওয়া থেকে উদ্ধার করে এই আলিয়া মাদ্রাসা। এই শিক্ষা তার সৃষ্টি থেকে আজ অবধি সর্বদা মাদ্রাসা শিক্ষা ধারার সাথে সাধারণ শিক্ষা ধারার সমন্বয় করে মাদ্রাসা ছাত্রদের যে কোনো প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা সৃষ্টিতে অসাধারণ অবদান রেখে আসছে।

ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী ১২০০ সালে সর্বপ্রথম এই অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং একইসাথে বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করেন মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকা। ইতিহাস অনুযায়ী তিনি রংপুরেও একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ম্যাক্সমুলারের মতে, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৮০ হাজার মাদ্রাসা চালু ছিল। কিন্তু বৃটিশ সরকার বাংলা দখল করে মসজিদ-মাদ্রাসার খরচ নির্বাহের জন্য বরাদ্দকৃত ‘ওয়াকফ সম্পত্তি' বাজেয়াপ্ত করলে মাদ্রাসাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। 

অতঃপর মুসলমানদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৭৮০ সালের ১ অক্টোবর বৃটিশ সরকার প্রতিষ্ঠা করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা। আর এ কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার আদলে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল শ্রেণির আলিয়া মাদ্রাসা। অক্টোবরের এ দিনটিতে যেহেতু আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ঐতিহাসিক পথচলা শুরু। তাই ১ অক্টোবর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয় একইসাথে দাবি উঠেছে সরকারি স্বীকৃতিরও।

বাংলাদেশে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূলস্রোত ধারায় চলে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৮৫ সালে দাখিল এসএসসি সমমানের সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৮৭ সালে আলিম, এইচএসসি সমমান আর ২০০৬ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধিত আইন-০৬ জাতীয় সংসদে পাস হলে ফাজিল ও স্নাতক ও কামিল স্নাতকোত্তর ডিগ্রির মর্যাদা লাভ করে। এছাড়া ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ হতে দেশের বিভিন্ন আলিয়া মাদ্রাসায় ফাযিল স্নাতক অনার্স কোর্স চালু হয়।

১৯২১ সনে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য সকল ডিপার্টমেন্টের সাথেই চালু হয় ইসলামী শিক্ষা ডিপার্টমেন্ট এবং সেখানে ছাত্র সরবরাহে একমাত্র সক্ষম ছিল এই আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের সর্বত্র এবং সর্বস্তরে কুরআন-হাদীসের শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে এই মাদ্রাসা। দেশ পরিচালনায় ও জাতি গঠনে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার অবদান চিরভাস্বর এবং চিরোজ্জ্বল।

দেশে মাদ্রাসার উন্নতি ও বিকাশ সাধনে বাংলাদেশ মাদ্রাসা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা হাফেজ ইমদাদুল হকের সাথে কথা হয়। তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলেন। যার মধ্যে রয়েছে–

প্রত্যেক গ্রামে একটি করে ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলো পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের ঘোষণা প্রদান; মাদ্রাসা ছাত্রদের বৃত্তির সংখ্যা এবং টাকার পরিমান বৃদ্ধি করা; প্রতিটি জেলায় একটি করে মডেল মাদ্রাসা স্থাপন এবং একটি করে ফাযিল/কামিল মাদ্রাসা সরকারিকরণ।

মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর স্থাপন ও একটি স্বতন্ত্র টেক্সট বোর্ড প্রতিষ্ঠাকরণ; ঢাকা বিভাগের বাইরে আরও পৃথক দু’টি মাদ্রাসা বোর্ড স্থাপন; পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে মাদ্রাসা ছাত্রদের ভর্তিবৈষম্য দূরীকরণ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল বিষয়ে ভর্তির সুযোগ করে দিতে হবে; মাদ্রাসা শিক্ষকদের দক্ষ ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষে প্রত্যেক জেলায় একটি করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে।

অক্টোবরকে জাতীয় মাদ্রাসা শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা প্রদান;  কামিল স্নাতকোত্তর পাস শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা যথা-এমএড, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভের সুযোগদান; মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যবাহী পোষাক পাঞ্জাবী-টুপি এবং রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ দাড়ির খোলস ব্যবহার করে নাটক সিনেমায় খলনায়কদের অভিনয় সহ সকল অপকর্ম নিষিদ্ধকরণ।

চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ; অনার্স এবং মাস্টার্স পর্যায়কে যত দ্রুত সম্ভব এমপিও ভুক্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে; ফাজিল ও কামিলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামুলক করতে হবে।

উল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো অতি সহজে শিক্ষার উন্নতির পূর্ণাঙ্গ অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে বলেও জানান তিনি।