সাকরাইন: বাঙালীর আদি উৎসব
পৌষ সংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি বলে যে উৎসব দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয় তার ঢাকাইয়া নাম সাকরাইন । ভারতে পরিচিত পৌষ সংক্রান্তি নামে, নেপালে এটা পরিচিত মাঘী নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে পরিচিত। আগে শরৎকাল থেকেই পুরাণ ঢাকার বাড়িগুলোর ছাদে ছাদে চলত ঘুড়ি বানানো, সুতা ধারানো, ঘুড়ি উড়ানো; ধীরে ধীরে ভিড় বাড়ত আর সেই ভিড় গিয়ে পুর্ণতা পেত সাকরাইনে । এখন সেসব দিন হারিয়ে গেছে, আকাশের দিকে তাকানোর সময় নেই মানুষের। তবে সাকরাইনের দিন এখনো পুরাণ ঢাকার আকাশে ঘুড়ি ওড়ে, আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রযুক্তিবিহীন বিকেলগুলোর কথা। তবে কালের পরিক্রমায় এই উৎসব হারাতে বসেছে বাঙালিয়ানা। সংস্কৃতি সংরক্ষণ করতে হয়। সাকরাইন সরকারিভাবে কোন ঘোষণা বা পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়ে অনেকটাই হাইব্রিড একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে । পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা সংস্কৃতির উপাদানের মিশেলে পালন করা হলেও এখনো পুরাণ ঢাকার মানুষের কাছে এর আবেদন অমলিন।
মকর সংক্রান্তি কী?
প্রাচীনকাল থেকেই এ উৎসব চলে আসছে। তবে সুস্পষ্টভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। হতে পারে এটা হাজার বছরের উৎসব বা তারও আগের। পুরাণের মধ্যেও এর উল্লেখ আছে। যার মধ্যে আমরা উত্তর পেয়ে যাই। পুরাণ অনুযায়ী, মকর সংক্রান্তির এ মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন। আবার অন্য মত অনুযায়ী, এ দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। বিষ্ণুদেব অসুরদের বধ করে তাদের কাটা মুণ্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন। তাই মকর সংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে। আবার অন্য মতে, সূর্য এ দিন নিজের ছেলে মকর রাশির দেবতা শনির বাড়ি এক মাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে বাবা ছেলের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিন হিসেবেও ধরা হয়।
আসুন দেখি বিজ্ঞান কী বলে?
বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের গতি দুই প্রকার। উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ণ। ২১ ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ণ থেকে দক্ষিণায়ণে প্রবেশ করে। এ দিন রাত সব থেকে বড় হয় আর দিন সব থেকে ছোট হয় । এরপর থেকে দিন বড় আর রাত ছোট হতে শুরু করে । মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ । আবার শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। পৌষ মাসের সংক্রান্তিকেই বলা হয় উত্তর সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। শাস্ত্র মতে, উত্তরায়ণে মৃত্যু হলে মুক্তি প্রাপ্তি হয় এবং দক্ষিণায়ণে মৃত্যু হলে ঘটে পুনরাবৃত্তি অর্থাৎ তাকে আবার সংসারে ফিরে আসতে হয়। সূর্য এ দিনই ধনু রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এর থেকেই মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি ।
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগরদ্বীপে প্রতি বছরই মকর সংক্রান্তিতে স্নানে হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাবেশ হয়। ঢাকায় চলে পূজা ও প্রার্থনা। চলে পিঠে উৎসব ও পিঠে বানিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। মিষ্টি, লাড্ডু তো আছেই। চলে ঘুড়ি উৎসব। ঘুড়িতে করে দেবতার কাছে বার্তা পাঠানো যাবে, ঘুড়ি উৎসবটা এসেছে মূলত এই চিন্তা থেকেই। মৌলভীবাজারের মতো কোথাও কোথাও চলে রাতভর মাছের মেলা। সাকরাইন মূলত হিন্দু লোক উৎসব হলেও এখন এ দিনটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পালন করে।
পুরাণ ঢাকার সাকরাইন:
পুরাণ ঢাকায় সাকরাইন পহেলা মাঘে পালন করা হয়। তাই আগামীকাল সোমবার এ উৎসব পালন করার কথা। সুত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার সহ পুরান ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় উৎসবটি পালিত হয়ে থাকে। তবে শাঁখারি বাজারের আদি হিন্দু পরিবারগুলি ১৫ জানুয়ারিকে পহেলা মাঘ মেনে এ উৎসব পালন করে, কেননা পঞ্জিকা অনুযায়ী এদিন পহেলা মাঘ। এদিন পুরাণ ঢাকার আকাশ ঘুড়িতে ঢেকে যায়। সন্ধ্যায় মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনে ফু দিয়ে আকাশে অগ্নিকুণ্ড তৈরি, ফানুস উড়ানো অথবা আতশবাজিতে মুখর থাকে আকাশ। সাকরাইনের সপ্তাহ খানিক আগে থেকে চলে প্রস্তুতি। সুতোয় কাঁচ, রঙ দিয়ে ‘মাঞ্জা’ দেয়া হয়। শাঁখারি বাজারের দোকানগুলিতে পাওয়া যায় বিভিন্ন আকার-আকৃতির ঘুড়ি। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বানিয়ে নেন ঢাউস ‘ল্যাঞ্জার’ ঘুড়ি। ঘুড়ির লেজকে পুরাণ ঢাকায় বলে ল্যাঞ্জা। ছাদে ছাদে বন্ধুবান্ধবের দল টাকা তুলে এসব আয়োজন করে। লাখ লাখ টাকার বাহারি আতশবাজি ফোটানো হয় সাকরাইনকে কেন্দ্র করে। সাকরাইনের আগ থেকেই অনেক পর্যটক ভিড় জমায় এখানে। নতুন ঢাকাসহ নানান এলাকা থেকে মানুষ আসে পুরাণ ঢাকায়।
সাকরাইনে স্থানীয় দোকানগুলিতে বেচাকেনা ভালো হয়। লাভবান হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়িরা। তবে পুরান ঢাকার অধিকাংশ ছাদে রেলিং না থাকায় প্রতিবছরই কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। আতশবাজির কারণে ঘটে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনাও। পশ্চিমা কিছু অপসংস্কৃতি কয়েক বছর ধরে হানা দিয়েছে পুরাণ ঢাকার ছাদগুলিতে। চলে ডিজে পার্টি ও মদপানসহ নেশাসেবন। সরকারিভাবে নেই তেমন কোনো নির্দেশনা বা উদ্যোগ ।
শিশু-কিশোরদের নিরাপদ পরিবেশে ঘুড়ি ওড়ানোয় উৎসাহিত করা উচিৎ। মাঠের অভাবে থাকা ঢাকাবাসীর সন্তানেরা ছাদে শিশু-কিশোরদের এ সুযোগ করে দিলে মানসিক বিকাশ ঘটবে। কম্পিউটারের এই যুগে মানুষকে একটুখানি আকাশের দিকে তাকানোর সুযোগ করে দেয় সাকরাইন। সরকারি সাহায্য, উৎসাহ ও প্রচারণা পেলে এ উৎসবে পর্যটকদের আরও সমাগম বাড়বে ।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়