১৩ নভেম্বর ২০১৮, ১০:০৬

ক্যান্টিন বয় থেকে বিনোদনের মহাতারকা

বিস্ময়কর প্রতিভা স্ট্যান লি

আপনি যদি কমিক্সপ্রেমী কিংবা ‘স্পাইডারম্যান’, ‘এক্স ম্যান’, ‘হাল্ক’, ‘আয়রনম্যান'র মত ছবিগুলো দেখে থাকেন; তাহলে আশা করি, চশমা পড়ুয়া ব্যক্তির পরিচয়টা দিতে হবে না। তাছাড়া চেনা যায়, এমন সংকেত কিন্তু দেয়াই আছে ছবিতে। তারপরও যদি না চিনে থাকেন, তাহলে জানিয়ে রাখি, উনি হলেন কমিক্স দুনিয়ার বিস্ময়কর প্রতিভা স্ট্যান লি। পুরো নাম স্ট্যান লি মার্টিন লিয়েবার। উপরে উল্লেখ করা সব সিনেমার স্রষ্টা তিনি।

১২ নভেম্বর গোটা বিশ্বের সিনেমাপ্রেমীদের কাঁদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর শিনাই মেডিকেল সেন্টারে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্ট্যান লির মেয়ে জেসি। খবর- দ্যা গার্ডিয়ানের। জেসি বলেন, ‌‘আমার বাবা তার সব ভক্তদের ভালোবাসতেন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে শালীন মানুষ ছিলেন’।

গার্ডিয়ানের খবর, স্ট্যান লি দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও চোখের সমস্যাসহ বেশ কয়েকটি অসুখের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। এরপর সোমবার সায়দার-সিনাই মেডিক্যাল সেন্টারে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দর্জির ঘরে জন্ম নিয়েও জীবন থেমে থাকেনি লি’র।

 

১৯২২ সালে নিউ ইয়র্ক শহরের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় লি'র। ‘সৌভাগ্য’ বিশ্বাস করতেন তিনি। বাবা জ্যাক লিয়েবার ছিলেন দর্জি। তবু থেমে না থেকে নিজেকে এগিয়ে নেন সামনের দিকে। নাম লেখান পৃথিবীর সফল ব্যক্তিদের তালিকায়। জানা যায়, মন্দার বাজারে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে স্কুলে পড়ার সাথে সাথে টুকিটাকি নানা কাজে যোগ দিয়েছিলেন লি।

চাচার সুপারিশে মাত্র ১৭ বছর বয়েসে ‘Times Comics’-এ যোগ দেয় লি। কিন্তু কাজ কমিকস্‌ লেখা বা আঁকা সংক্রান্ত কিছু ভাবলে খুব ভুল করবেন। প্রথম দু’বছর স্ট্যান লি ছিলেন ক্যান্টিন বয়। ডিউটির অন্তর্ভুক্ত ছিল কর্মচারীদের লাঞ্চ এনে দেওয়া, তাদের টেবিল পরিষ্কার রাখা, দোয়াত-কলম গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি। অবশেষে ১৯৪১ সালে বেশ সাহস করেই প্রথম কমিক্স ‘Captain America Foils the Traitor’s Revenge’ লিখে ফেলেন লি। কমিক্সটি প্রশংসনীয়ভাবে উতরেও যায়।

প্রত্যাশিতভাবেই কোম্পানির প্রকাশক মার্টিন গুডম্যানের সুনজরে। এরপর লি উন্নীত হন কোম্পানির অন্তর্বতী সম্পাদক ও পরবর্তীতে স্বয়ং প্রকাশকের পদে। ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত স্ট্যান লি ‘Times Comics’ সারা দুনিয়ার বিনোদনজগত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকার সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন স্ট্যান লি। আট বছর সৈন্যবাহিনীতে থেকে ১৯৫০ সালে লি আবার ফিরে যান পুরোনো কোম্পানিতে, যা ইতিমধ্যে নাম পাল্টে ‘Atlas Comics’ হিসাবে পরিচিত ।

জীবনের অধিকাংশ সয়ম কালো চশমা পড়ে কাটিয়েছেন এই তারকা

 

পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ‘Atlas Comics’ এর চিরপ্রতিদ্বন্ধী DC Comics এর ‘Justice League of America’ নামক কমিক-স্ট্রিপটির প্রভূত সাফল্য লক্ষ্য করে মার্টিন গুডম্যান, স্ট্যান লি কে বলেন কমিক্সের বাজারে নতুন কিছু জবরদস্ত চরিত্রের আমদানি করতে। এই সময়ই বলা যেতে পারে স্ট্যান লি-র হাত ধরে সুপারহিরো কমিক্সের ঘরানায় এক বিপ্লব আসে। জ্যাক কার্বি, জো সাইমন ও অন্যান্য লেখক চিত্রশিল্পীদের কালি-কলমের রেখায় আবির্ভাব হতে থাকে Fantastic Four, Hulk, Thor, Iron-Man, X-Men, Daredevil – এবং অবশ্যই Spider-man এর।

এখানেই শেষ নয়, স্ট্যান লির নির্দেশনায় প্রতিটি চরিত্র হয়ে ওঠে বাস্তবতায় পরিপূর্ণ । তারাও কলেজে সিলেবাসের চাপ, প্রেমিকার সাথে ঝগড়া, মাসের শেষে পকেটে টান, বেকারত্ব, এমনকি সর্দিকাশিরও সম্মুখীন হয় প্রায়ই । স্বভাবতই আমজনতা এদের লুফে নেয় ।

তাছাড়া বইয়ের কাটতি বাড়াতে লি আরেক স্ট্র্যাটেজি নেন, যাকে বলা যায় flexibility of characters, অর্থাৎ কোন চরিত্রকে নির্দিষ্টভাবে নায়ক বা খলনায়ক- এর তকমা এঁটে দেওয়া যাবে না। যাকে দেখলে হয়তো মনে হবে যে এর থেকে জঘন্য দুশমান আর হতে পারে না, আরেকটা সিরিজের পাতা উল্টে দেখলেন সেই সেখানে পরিত্রাতার জুতোয় পা গলিয়েছেন। এছাড়া আরেকটা ট্রেন্ড দেখা গেল যে, চরিত্ররা শুধু তাদের নিজস্ব সিরিজেই আবদ্ধ থাকছে না। এ ক্ষেত্রে Spiderman-এর গল্পে অনায়াসে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলো Tony Stark ওরফে Iron-manকে, আবার হয়ত X-men-এর ম্যানসনে শোনা গেলো Hulk-এর হুঙ্কার । এরকম আগ্রহী পাঠককে পুরো গল্পের খেই ধরতে হলে একসাথে সমস্ত সিরিজের বই জোগাড় করা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই Atlas Comics এবং পরবর্তীকালের Marvel Comics অর্থনৈতিক দিক থেকে সাফল্যের শিখরে উঠে যায়।

কিন্তু সব অর্জনই রেখে গেলেন প্রিয় লি। চলে গেলেন এমন দেশে, যেখান থেকে কেউ ফেরে না। ওপারে ভালো থাকুন বিনোদন জগতের মহাতারকা, বিশ্বের সকল কমিক্সপাগলদের পক্ষ থেকে সেই কামনাই রইলো