১১ নভেম্বর ২০১৮, ২০:৪৮

পত্রে অনিক

স্কুলটা দেখতে অনেক সুন্দর। যখন দখিনা বাতাস আসে তখন অস্থির লাগে। পাঠে মন না বসলে স্কুল সুন্দর বলে আর কি হবে? ‘বেল পাকলে কাকের কি’ আমার ও ঠিক সেই অবস্থা। যদিও স্কুলটা আগে এতোটা সুন্দর ছিল না। নতুন প্রজেক্টে স্কুলের এই বহুতল ভবন হবার পর স্কুলের এত সৌন্দর্য। শুনেছি ভবন হওয়াতে নাকি স্কুলে নতুন শিক্ষকও আসবে। কে জানে, খটখটি  রাস্তা পার হয়ে সে কত দিন এই স্কুলে থাকে। স্কুলে যাবার রাস্তাটার বেহাল দশা। না পাকা,না কাঁচা। টোস্ট বিস্কুট খেতে যেমন খটখট শব্দ, ভ্যানে চড়ে স্কুলে যেতে তেমন একে অপরের গায়ের সাথে গা লেগে খিস্তি খেউর অবস্থা। ভ্যান চালককে একদিন বলেই বসলাম ভাড়া দিয়ে স্কুলে যাবো তাও আবার ঘ্যাতানি খাবো? সোজা করে ভ্যান চালান। নয়তো দেখে ছাড়ব। ও ব্যাটা কথা শুনে কাবু হয়ে গেল মনে হয়। সত্যি আর কোথাও না পারলেও সমাজের নিচু তলার মানুষের সাথে খুব ফাঁফড় নিতে পারা যায়। আমি, অনিক তার প্রমাণ।

একেতো স্কুলের প্রতি আগ্রহ শূন্যের কোঠায়, তার উপর রাস্তার বেহাল দশা। ওদিকে বিদঘুটে কেমিস্ট্রি ক্লাস!

একদিন যদি বিক্রিয়া ভুল হয় কেমিস্ট্রি স্যার প্যান্টের অবস্থা খারাপ করে ফেলে । পাঠে অমনোযোগ, রাস্তার বেহাল দশা, স্যারের দুর্ব্যবহার সব মিলিয়ে যেন মরার উপর খারার ঘা।

নতুন শিক্ষক আসলেই পারে। কেন যে আসে না। এই চারচোখের হাত থেকে অন্তত পক্ষে বাঁচা যাবে। কোন একটা বিষয় কম বুঝতেই পারি, তাতে কি? না তাতে তার চলবে না। কেমিস্ট্রি বুঝতেই হবে। শুনেছি রাস্তা নাকি মেরামতের কাজ হচ্ছে, যাক বাঁচা যাবে। তখন ভ্যানে উঠলে আর টোস্ট বিস্কুটের কথা মনে হবে না, মনে হবে বিএমডব্লুতে চড়ছি। মনোযোগ শূন্যর কোঠায় হলেও বিক্রিয়া ব্যতিত আমিই ক্লাসে প্রধান।

-চলে এসেছে আমাদের উচ্চ পাওয়ার সমৃদ্ধ, চার চোখ বিশিষ্ট, বিক্রিয়া আমার মাথায় ঢোকাতে অক্ষম কেমিস্ট্রি স্যার। আজ যে আমার অবস্থা কি হবে! কি আর হবে। অর্ণব, সুবর্ণা, লাবনী ওদের যা হবে আমারও তাই হবে। ক্লাসে কি আমি একা কম বুঝি, ওরাও তো বোঝে না।

পাঠে মন দেই জনাব চলে এসেছেন,

আজ বিক্রিয়া না বুঝলেও কোন শাস্তি প্রদান করব না তোমাদের, কাল একজন নতুন শিক্ষক আসবে সম্ভবত কেমিস্ট্রি ক্লাস নিবে, আমার সহযোগী হিসাবে।

যাক বাঁচলাম, এবারতো এই চারচোখের হাত থেকে রেহাই পেলাম। নতুন যে আসবে সে যেন অন্তত পক্ষে এমন কাটখোট্টা আচরণ না করে। এমন কথা বলতে বলতে পাঠ চুকিয়ে পন্ডিত মহাশয়ের সাথে সাথে ছাত্র ছাত্রীরা নিজ নিজ গৃহে চলে গেল।

অন্য দিনের মত আজও সকাল হয়েছে, নয়টা বাজতেই স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীরা আসতে শুরু করেছে, তবে আজ স্কুলটা নতুন কিছু পাবার আশায় মুখরিত হয়ে বসে আছে। আমিও আছি, কারণ স্কুলে নতুন শিক্ষক আসবে। যেই ভাবছি, সেই মুহুর্তেই উনি চলে এসেছে। অফিস রুমে কোন দিক দিয়ে প্রবেশ করল বুঝতে পারি নি। তবে সকলে যে নিজ নিজ মনে সালাম আদায় করছে তা বুঝতে পারছি। আমি আর উঠে গিয়ে সালাম দিলাম না, ভাবলাম একটু সময় নিয়ে পরে দেখা করে সালাম দিবো। একটা গুন অবশ্য আমার আছে, নিজেকে সব সময় জিরো পয়েন্টে দাড় করাতে ইচ্ছা করে। তাই দেরি করে দেখা করতে যাবো। আমি একা যাবো। নিজের মত করে নিজের পরিচয় দিয়ে আসবো। কথায় আছে প্রথম পরিচয় হলো বড় পরিচয়। আমি যে স্কুলের মধ্যে বাকপটুতে সেরা সেটাও অল্প পরিসরে বোঝাব।

দেবযানী রায় দেবী, নতুন শিক্ষকের নাম। সত্যিই মনে হয় দেবী। কে তাকে এমন করে নিজে হাতে রক্ত মাংস দিয়ে টিপে টিপে তৈরি করেছে? সে বিষয়ে আমাকে বেশ সময় নিয়ে ভাবতে হবে। গায়ের রংই বলে দিচ্ছে তার জন্ম কোন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তবে এও মনে হচ্ছে তিনি শুধু উচ্চ মেধাসম্পন্ন না বরং উচ্চ আদর-যত্ন সম্পন্ন মানবী হবে।

রোজকার মতোই কেমিস্ট্রি ক্লাস হয় তবে ক্লাস এখন ডাব্লু স্যার নেয় না, দেবযানী ম্যাডাম নেয়। সেই একই বিষয়, একই বিক্রিয়া, একই সূত্র অথচ আগে কেমন মাথায় ঢুকত না একটু বুঝতে পারতাম না। আর এখন খুব সহজে বুঝতে পারি। তবে এটা কিভাবে সম্ভব, সেই বিক্রিয়া টা বুঝতে পাড়ছি না।

কথায় আছে না মানিকে মানিক চেনে। বিষয়টাও তাই, আমি যে পাঠ খুব ভালো বুঝি, ক্লাসে আমিই যে সব বিষয়ে সেরা সেটা ম্যাডামও বুঝতে পেরেছে। এখন দেখা যাক, আমি পাঠ কত দিন বুঝতে পারি আর ম্যাডাম কত দিন স্কুলে থাকে, এই শিয়ালডাঙ্গা খটখটি রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে এসে। শিয়ালডাঙ্গা বললাম এই কারণে, দিনে তিন চাকার ভ্যান খটখট করে চলাচল করলেও রাতে হুক্কা হুয়া করে হাক দেয়া শিয়াল গুলো রাজত্ব করে এই রাস্তা জুড়ে।

দেবীর আসা যাওয়ার টাইম একদম ঠিক। সব শিক্ষকের আগে চলে আসবে, প্রত্যেকের সাথে একদম মায়াবী ব্যবহার। কিন্তু সেটা কিভাবে, স্কুলে তো আরও অনেক ম্যাডাম আছে অথচ সবাই কেমন দেবী ম্যাডামের সুনামে পঞ্চমুখ। শুধু তার রুপে না গুনেও। তারা রুপের কথা নাই বলি, যেমন উচ্চতা তেমন রঙ আর তেমন তার চেহারা।

সুবর্ণা বলে দেবী ম্যাডাম কি শুধুই দেবী, সে তো রুপে লক্ষী, গুনে সরস্বতী! তবে এমন কথা শুনেছিলাম লক্ষী আর সরস্বতী একসাথে থাকে না কিন্তু ম্যাডাম আবার দুজনেরই বর পেয়েছে।

প্রতিদিন স্কুলে আসতে আর কিছু না হোক মায়াবী কাজল তাকে দিতেই হবে। সে দিন দেখলাম ছাদে ম্যাডাম ছাত্রীদের সাথে নিয়ে ফুলের চারা লাগাচ্ছে। আমাদের স্কুল আগে কি ছিল, আর এখন স্কুলের অন্য রকম চেহারা। দেবী ম্যাডাম নিজেই স্কুলের এই সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে জড়িয়ে আছে। সম্পূর্ণ  মাঠে সবুজ ঘাস। জাতীয় পতাকার দুপাশে লাগানো কৃষ্ণচূড়ার রঙ দাউ দাউ করে জ্বলছে। ওদিকে ছাদে ফুলের বাগান। গাঁদা, গোলাপ, চাপা, কামিনীর রঙ আর সৌরভে যেন একেবারে স্বর্গপূরী।

অর্ণবকে সাথে নিয়ে সেখানে যেতেই আমাদের বলল এই তো চলে এসেছে দলনেতা, কোথাও তার পদার্পণ হবেনা এমনটা ভাবাই দায়। শোন তোমাদের বুঝিয়ে দেই, সুন্দর সব কিছুকে বিধাতা  একটু সময় নিয়ে তৈরি করেছে। তাই মানুষ এত সৌন্দর্যের পূজারী। সুবর্ণা বলল ম্যাডাম আপনি ঠিক বলেছেন, তাই মনে হয় বিধাতা আপনাকে সময় নিয়ে গড়েছে। ম্যাডাম বলল, না সুবর্ণা আমার কাছে আমার ছাত্র ছাত্রীরা একদম ফুলের মত সুন্দর। আমার দেখা সুন্দর মুখগুলো হলো তোমরা সকলে। আমরা সকলে স্তব্ধ হয়ে তারা কথা শুনছিলাম। আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করে ম্যাডাম বলল শোন, আমাদের স্কুলের সৌন্দর্য যেন আরো বৃদ্ধি পায় তাই এত পরিচর্যা। ধরো, কোন একটা টবের ফুল গাছ মারা গেছে সেই শূন্যস্থানকে পূরন করা তোমাদের দায়িত্ব। তোমারা বিশ জন যদি এক টাকা করে দাও, তাহলে একটা ফুল গাছ হয়ে যাবে। সকলের প্রচেষ্টায় কঠিন কাজ সহজ হয়। কখনও আমাকে জানালে আমি একটা গাছ এনে লাগালাম, রানু আপাকে জানালে সে একটা গাছ এনে লাগাল। এতে করে আমাদের ভারসাম্য ঠিক থাকল। কি! আমি কি কঠিন কোন কথা বললাম? 

কঠিন তো একেবারেই নয়। তবে কথা গুলো এত মনোমুগ্ধকর কিভাবে হয় আমি তাই ভাবছি । ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম তিন শ্রেণি পার করে আসলাম এই স্কুল থেকে। খেলার মাঠ, ক্লাস রুম, স্কুলের ছাদ, ফুলের বাগান কোন স্থানে এত সিগ্ধ অনুভূতি পাইনি। অথচ কয়েক মাসে স্কুলটা যেন স্বর্গরাজ্য হয়ে গেছে। সাথে মমতাও আছে। কথা গুলো মনে মনে ভাবতেই, ম্যাডাম বলল; কি! চুপ করে আছো কেন তোমরা। আমার কথা বোঝনি।

ম্যাডামের কথার উত্তর দিব ভেবে, আমি তাকাতেই দেখি ম্যাডামের চোখে কাজল নেই, একথা বলার আগে সাতবার ভেবেছি বলব কি না, পারলাম না। একবার কোন কথা বলতে চাইলে সে কথা মুখ থেকে আমি না চাইলেও বের হয়। আমি অকপটে বলে ফেললাম, আজ কাজল দেন নি কেন? কথাটা শোনার জন্য হয়তো সে প্রস্তুত ছিল না, নিজেকে ক্ষাণিক নিয়ন্ত্রণ করে আমার দিকে তাকালো। আমিও পিছন ফিরে না তাকিয়ে চলে আসলাম তেত্রিশটা সিঁড়ি বেয়ে নীচ তলায়।

এসেই মেয়েদের মুখে শুনলাম ম্যাডাম ওদের কাছে শিউলি ফুল চেয়েছে সরস্বতী পূজার জন্য। গ্রুপ ক্যাপ্টেন সুবর্ণা বলল ওদের নিমন্ত্রণও দিয়েছে। মনে মনে ভাবলাম আমার কথা কেন বলেনি আমি কি তাহলে! এই কথা ভাবতেই হঠাৎ ডাক পড়ল দেবী ম্যাডাম, ডাব্লু স্যার আমাকে ডেকেছে।

তাদের সামনে উপস্থিত হতেই স্যার বলল; দলনেতা আপনি থাকেন কোথায়? কাল সরস্বতী পূজা উপলক্ষে দেবী ম্যাডাম নবম শ্রেণির ছাত্র ছাত্রীদের নিমন্ত্রণ করেছে।

-স্যার সুবর্ণা বলল ম্যাডাম ওদের নিমন্ত্রণ দিয়েছে। ম্যাডাম বললো, ওদের মধ্যে তুমিও আছো। আমি চুপ হয়ে গেলাম, ভাবলাম আমার উপর কি ম্যাডাম রাগ করে আছে। কেন মন খুলে কথা বলল না!

থাক সে কথা, আর যাই হোক ম্যাডামতো আর স্কুল ছেড়ে যাচ্ছে না। না হয় সামান্য চড়া হয়েছে আমার উপর। এই ভাবতে ভাবতে ক্লাস টাইম শেষ, নিজ নিজ গৃহের দিকে চললাম সবাই।

সরস্বতী বিদ্যার দেবী। হিন্দু,অহিন্দু বলে কিছু নাই এই ভেবে আমরা সকলে মিলে পূজা দেখতে গেলাম। বাণী অর্চনার মধ্যে দিয়ে পূজা শেষ কওে প্রসাদ নিয়ে আমরা চলে আসলাম।

পরদিন স্কুলে এসে মনে হলো, আজ সবকিছু কেমন নীরব  নীরব লাগছে। মাঘের শীতে বাঘ ও কাঁপে এমন কথা শুনেছি, সূর্য মামারও দেখা পাওয়া ভার। হয়ত এই জন্য সবাই জমে আছে। কিন্তু আমার এখন গৃহে মন বসে না। আগে প্রচুর স্কুল ফাঁকি দিলেও এখন আর স্কুল ফাঁকি দিয়ে লেপের নীচে শুয়ে থাকতে মন চায় না কেন তা বুঝে উঠতে পারলাম না।

যথারীতি ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরব এমন সময় দেখি, স্কুলের সামনে তাল গাছটার পাশে দেবী ম্যাডাম ভ্যানের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আজ সাইকেল নিয়ে এসেছি।

অষ্টম শ্রেণি হতে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে ক্যাপিটাল লেটারের সাথে প্রক্রিয়া প্রতীকের প্রথম চিহ্নকে যুক্ত করতে পেরেছিলাম। তাই আমার "এ প্লাস" পাওয়াকে কেন্দ্র করে বাবা আমাকে "সাইকেল চালান গাড়ী চালান থেকে কঠিন " এই ট্রান্সলেশন করতে পারার শর্তে জেলা সদর থেকে সাইকেলটা কিনে দেন। আমি স্কুলে আসতে মাঝে মাঝে আমার এই দুইচাকাকে নিয়ে আসি।

ম্যাডামকে একা দেখে কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, ভ্যানের জন্য অপেক্ষা করছেন? উত্তর দীর্ঘ হলো। বলল হ্যাঁ,আজ তো নদীর ওপারে হাট তাই ভ্যান পাওয়া একটু কঠিন হবে। কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আমি বললাম, হেঁটে যেতে পারবেন না? পারব, পারব না কেন। তবে অনেকটা পথ। আমি তখন বললাম, চলেন অপেক্ষা না করে হেঁটে যাই আপনার সাথে।

-তোমার সাইকেল।

আমি বললাম এটিও হাঁটবে আমাদের সাথে। একটু হেসে ম্যাডাম বলল চলো দুজনে অনেকটা পথ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আড় চোখে একবার তাকালাম ম্যাডামের দিকে। সত্যি দেবী।

কিছু দূর পথ যেতেই শিমুল তলায় কিছুক্ষণ দাঁড়াল। একদম ফোঁটার অপেক্ষায় আছে শিমুলের ফুল গুলো। যেন মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইছে। ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম আবার। কিছুদূর যেতেই দেখলাম সামনের রাস্তা একেবারে কাচা। মাটি গুলো ধব ধবে সাদা। দুইপাশে বিল। এক পাশে কচুরিপানার ফুল ফুটে আছে আর এক পাশে সাদা বক ঠোঁট দিয়ে হয়তো মাছ ধরার চেষ্টায় আছে। দৃশ্যটা একেবারে মন ছুঁয়ে যায়। এর মাঝে ম্যাডাম আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছে আর তার গল্প বলছে। এতোটা সরলমনা হয়ে আমাদের সাথে কথা বলে ম্যাডাম, দেখে বোঝার সাধ্য নেই যে দীর্ঘ সময় সে শহরে কাটিয়েছে।

এমন সময় আযান দিয়ে দিল। ম্যাডাম বললেন, অনিক তুমি চলে যাও এবার। সামনে কাচা রাস্তা পার হলেই আমাদের বাড়ি। এখন আমি সহসা চলে যাব। তোমার আবার দেরী হবে, অনেকটা পথ যাবে।

-আমি সাইকেলে এক টানে চলে যাবো। আপনি আমার চিন্তা করবেন না।

-অনিক তুমি না হয় আমাদের বাড়ি চলো।

-না, আজ আর যাবো না। আপনি তাহলে যান।

সাইকেল ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি ম্যাডাম তাকিয়ে আছে। যতদূর আমার সামনের পথ দেখা যায় হয়তো ততদূর দৃষ্টি।

হিমেল তিন তলায় এত ভীড় কেন? চল দেখি। অডিটোরিয়ামে তো জায়গায় নেই। এত ফুলের গন্ধ ছড়াচ্ছে। গাঁদা ফুল দিয়ে ওটা কি লেখা, গায়ে হলুদ!

কি রে সুবর্ণা গায়ে হলুদ মানে? অডিটোরিয়ামে আবার গায়ে হলুদ কিসের?

-কেন,তোর চোখ নেই। দেখতে পাচ্ছিস না লেখা আছে দেবযানী ম্যাডামের গায়ে হলুদ।

মানে কি?

-মানে সত্যি।

কই আমি তো কিছুই জানিনা।

-এখন জানলি তো।

ডাব্লিউ স্যারের অনুমতি নিয়েছিস?

-তা আর বলতে। তার ইচ্ছেতেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে।

সবাই অনেক মজা করছে, তবে আমি যেন তীব্র শীতেও চৈত্রের বৃষ্টি না পাওয়া জমির মতো ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাকে কেন বলা হয় নি অনুষ্ঠান সম্পর্কে, নাকি অন্য কোন কারণ। গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান শেষ। সবাই মজা করলেও আমি স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। ছাদের যে জায়গায় কামিনী, গাঁদা সুবাস ছড়াচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছি না ফোটা ফুলের কলি হয়ে। যেন কোন দিন এই ফুল ফুটবে না সুভাস তো দূরের কথা।

কি উপহার দেওয়া যায় এই নিয়ে যখন ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে জল্পনা-কল্পনা চলছে, তখন অনিক সেখানে অনুপস্থিত। কারও কোন খেয়াল নেই তাকে নিয়ে, অথচ সে সব কাজের আগে থাকে দায়িত্বপালন করে।

এমন সময় অনয় গিয়ে বলল কি অনিক তোর কি মন খারাপ এখানে একা দাঁড়িয়ে আছিস। আয় আমরা কি উপহার কিনব তাই নিয়ে আলোচনা করছি। সুবর্ণা এসে বলল অনিক তুই যাবি না। কোথায় যাবো। বাব-বা তুই মনে হয় আকাশ থেকে পড়ছিস কিছুই জানিস না এমন। আজ দেবী ম্যাডাম সাত পাকে বাঁধা পড়বে।

সাত পাকে বাঁধা পড়বে?

-হুম, সাত পাকে বাঁধা পরবে।

মঙ্গল ধ্বনি আর সাঁনাইয়ের সুরে মুখরিত রায় পরিবার। আত্মীয় স্বজনের সাথে ছাত্র ছাত্রীরাও উপস্থিত হয়েছে বিয়ে অনুষ্ঠানে।

নিয়ম মেনে রীতিসিদ্ধ ভাবে বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। কিন্তু কোন এক ফাঁকে মনে হলো সবাই এসেছিল অনিক মনে হয় আসেনি।

ঘড়ির কাটা পালাক্রমে ঘুরে যাচ্ছে, রাত্রিও গভীর হবার বাঁকে। বধু বরনের সাজ এখনও আছে। শাড়ীর কুচিতে লেগে আছে হয়তো পাওয়া না পাওয়া ছোট বড় অথবা বিন্দুসম অব্যক্ত ভালোবাসা। সে কথা হয়তো সে জানেই না।

এমন সময় ক্রিং ক্রিং করে ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো.......

-হ্যালো....

অনিক বলছিলাম

-অনিক তুমি ফোন নম্বর কোথায় পেলে আর এত রাতে ফোন করেছ কেন? তুমি আসনি কেন?

আপনি চিঠি পেয়েছেন,

-কিসের চিঠি?

সুবর্ণা বলে নি কিছু?

-না বলে নি তো।

উপহারের মধ্যে চিঠি আছে।

তড়িঘড়ি করে ফোন রেখে দেবযানী সমস্ত উপহারের মধ্যে ছাত্র ছাত্রীদের উপহার খুঁজে বের করে। রবীন্দ্রনাথ এর ভাষায় তেরো চৌদ্দ বছরের মত এমন বালাই আর নেই। অনিকও কি কিশোর বয়সে চিঠি লিখে তার মনের সকল ভাব ব্যক্ত করে বালাই হয়ে গেল, দেবযানী রায় বা সমাজের কাছে।

কি লেখা ছিল ঐ চিঠিতে। যা পড়ে দেবী ভাবছে, অপাত্রে "ঘি" ঢালতে  নেই। ঘি তো দূরে থাক ভালো ছাইও ঢালতে নেই। পাত্র যদি ফুটা হয়, যদি তলি না থাকে তবে ছাইও বের হয়ে যায়। নিয়ম ভাঙলে কি হয় তা আমি জানলেও এই কিশোর হয়তো জানে না। তাই সে ভাবনা গুলো অতি সহজে ব্যক্ত করেছে।

চিঠির দুই লাইন পড়ে আমার হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল। আর এগুতে পারছিলাম না, তবে এটা সত্য অনিক চিঠির ওপারে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি আর কখনো তার সামনে দাঁড়াতে পারব কি না তা জানি না। কখনও মোটা দাগের কাজল ঐ দু'নয়নে দিতে পারব কি না তাও জানি না। এ রকম কিছু "না" এর মাঝে ঠিক কোন না শব্দের জন্য আমি নিজেও দুনয়ন হতে দু ফোঁটা অশ্রু ফেলে কাকে উৎসর্গ করলাম তা বলতে পারি না।

তবে এটা বলতে পারি সাতপাঁকে বাঁধা পরার সে রাতে আমি কোথাও কারো চিঠিতেও বাঁধা পরেছিলাম।

লেখক: সহকারী শিক্ষিকা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়