১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৬

সেহরির পর নিয়ত না করলে রোজা হবে?

সেহরিতে রয়েছে বরকত  © সংগৃহীত

রমজান ইবাদতের বসন্তকাল। এ মাসে মুমিনরা ইবাদত-বন্দেগিতে মনোনিবেশ করেন। রোজা রাখার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো সেহরি, যাতে বরকত রয়েছে। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, সেহরির পর আলাদাভাবে নিয়ত না করলে কি রোজা হবে?

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ত করা ফরজ। তবে রমজান মাসে শেষ রাতে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে ওঠা এবং সেহরি খাওয়াও নিয়তের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কেউ যদি রোজা রাখার নিয়তে সেহরি খান, তাহলে আলাদাভাবে মুখে নিয়ত না বললেও তার রোজা আদায় হয়ে যাবে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, আরবিতেও পড়া বাধ্যতামূলক নয় (আল-বাহরুর রায়েক: ২/৪৫২; আল-জাওহারুতুন নাইয়্যিরাহ: ১/১৭৬)।

বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট আরবি নিয়ত মুখে পড়ার প্রচলন রয়েছে। তবে তা হাদিস বা ফিকাহর মৌলিক গ্রন্থে বর্ণিত হয়নি। কেউ চাইলে পড়তে পারেন, কিন্তু নিয়ত মুখে পড়ার চেয়ে অন্তরের ইচ্ছাই মূল বিষয়।

নিয়ত শব্দের অর্থ মনের ইচ্ছা, সংকল্প বা প্রতিজ্ঞা। এটি অন্তরের কাজ; জিহ্বার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো আমল শুরু করার আগে অন্তরে যে ইচ্ছা পোষণ করা হয়, সেটিই নিয়ত। তাই কেউ মুখে উচ্চারণ না করলেও অন্তরে রোজার নিয়ত থাকলে রোজা সহিহ হবে (আল-বাহরুর রায়েক: ২/৪৫২; আল-জাওহারুতুন নাইয়্যিরাহ: ১/১৭৬; রদ্দুল মুখতার: ৩/৩৩৯, ৩৪১; ফতোয়া হিন্দিয়া: ১/১৯৫)।

তবে কেবল সেহরি খাওয়াকেই নিয়ত বলা সঠিক নয়। যদি সেহরির সময় রোজা রাখার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তা নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে না (কিতাবুল ফিকাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৮৮১)।

ফরজ রোজার নিয়ত রাতে করাই উত্তম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের আগে রোজা রাখার নিয়ত করবে না, তার রোজা (পূর্ণাঙ্গ) হবে না।’ (আবু দাউদ: ১/৩৩৩; আল-বাহরুর রায়েক: ২/২৫৯-২৬০; বাদায়েউস সানায়ে: ২/২২৯)।

আরও পড়ুন: রোজার নিয়ত ও সেহরির দোয়া

তবে রাতে নিয়ত করতে না পারলে দিনে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলার প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে পর্যন্ত নিয়ত করা যাবে। শর্ত হলো—সুবহে সাদিকের পর থেকে নিয়ত করার আগ পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী কোনো কাজ করা যাবে না (ফতোয়া হিন্দিয়া: ১/১৯৫; রদ্দুল মুখতার: ৩/৩৪১)।

নিয়তের সময় শুরু হয় আগের দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে। যেমন—বৃহস্পতিবারের রোজার নিয়ত বুধবার সূর্যাস্তের পর করা যাবে। তবে বুধবারের সূর্যাস্তের আগে বৃহস্পতিবারের রোজার নিয়ত করা যথেষ্ট নয়; কারণ হাদিসে রাতে নিয়তের কথা বলা হয়েছে (আলমুহিতুল বুরহানি: ৩/৩৪৩; রদ্দুল মুখতার: ২/৩৭৭)।

প্রত্যেক রোজার জন্য পৃথক নিয়ত করতে হবে। কেননা প্রতিটি রোজা স্বতন্ত্র আমল। হাদিসে এসেছে, ‘সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি: ১/২; আলমুহাল্লা: ৪/২৮৫; মাবসুত, সারাখসি: ৩/৬০; ফতোয়া হিন্দিয়া: ১/১৯৫)।

প্রচলিত রোজার নিয়ত হলো—
نَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضَا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّل مِنِّى اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم
উচ্চারণ: ‘নাওয়াইতু আন আছূমা গাদাম, মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করলাম। তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল কর; নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।’

সারসংক্ষেপে, সেহরির পর আলাদাভাবে মুখে নিয়ত না বললেও, যদি অন্তরে রোজা রাখার দৃঢ় ইচ্ছা থাকে, তবে রোজা সহিহ হবে।