বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন আমাকে ঘুমাতে দেয়নি

রাবি ভর্তি পরীক্ষা
  © টিডিসি ফটো

সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু হাজারো শিক্ষার্থীর ভর্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের দিন তত নিকটে আসছে। আগামী ১৪ জুন ২০২০-২১ সেশনের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে হাজারো শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের যাত্রা আরো একধাপ এগিয়ে আসলো।

সুতরাং তিন মাসের কর্মপ্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ই নির্ধারণ করবে কে হতে চলেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নীলাভূমি ৭৫৩ একরের নব সদস্য। কেননা ক্যাম্পাস জুড়ে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্বশিল্প, সাজানো গোছানো পরিবেশ এবং শিক্ষার গুনগত মনে দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠের নাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যার ফলে ভর্তিচ্ছুরা ক্যাম্পাস চত্বরে পদার্পণের পরেই প্রেমে পড়ে যায় তার।

ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য জয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাস ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এ’ ইউনিটে দ্বিতীয় হওয়া শিক্ষার্থী সোহাগ আলী। সোহাগের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি— রায়হান ইসলাম

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পাওয়ার জন্য আপনি কীভাবে পড়েছেন, দৈনন্দিন রুটিন কী ছিল?
সোহাগ আলী: বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার জন্য কীভাবে পড়েছি এখন সেটার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিতে পাররেও একটি কথা বলতে পারি, দেশের অন্যতম একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের একটা জায়গা করে নেয়ার স্বপ্ন দেখেছি প্রতিনিয়ত। যে স্বপ্ন আমাকে লক্ষ্যে না পৌঁছানোর আগে ঘুমাতে দেয়নি।

যার ফলে কাঙ্ক্ষিত সেই স্বপ্নের প্রত্যাশায় প্রতিদিন অন্তত ৯-১০ ঘন্টা পড়েছি। তবে নির্ধারিত কোন রুটিন করে নয়, প্রতিদিন রাতে বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের কিছু টপিক নির্ধারণ করতাম যেগুলো আমার ভালো লাগত এবং পরদিন সেগুলো অবশ্যই শেষ করতাম।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার কোনো সহজ টেকনিক আছে?
সোহাগ আলী: বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সহজ বা শটকাট টেকনিক আছে কি না আমার জানা নেই। এটি লক্ষ্য জয়ের একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেটা উচ্চ মাধ্যমিকে পা দিয়েই একজন শিক্ষার্থী নির্ধারণ করে এবং সেই অনুযায়ী পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া।

তবে এতোটুকু বলতে পারি, জীবনে কোন কাজই খুব কঠিন কিংবা খুব সহজ নয়। কাজ যেমনই হোক সেটাকে নিজের মতো সহজ করে লক্ষ্য জয়ের পথে এগিয়ে যেতে হবে। তার জন্য যেমন কঠোর অধ্যবসায় প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাস।

পড়ুন: রাবি ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে অবশ্যই অন্যের থেকে ব্যতিক্রম চিন্তাধারার অধিকারী হতে হবে। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয় বাদ দেয়ার জন্য; এটা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে। সুতরাং কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যোগ্য তা আগে থেকে নির্ধারণ করে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত দশ বছরের প্রশ্নপত্র দেখে সিলেবাস শেষ করা।

বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানের কিছু কমন টপিক ও কিছু ব্যতিক্রম প্রশ্ন প্রতিবার পরীক্ষায় আসতে দেখা যায়। সুতরাং সেগুলো অবশ্যই আগে শেষ করা। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, পরীক্ষা টেনশনে আবেগ-আপ্লুত হয়ে সারাদিন-রাত পড়াশোনা করা কিংবা সবকিছু তো পড়ায় আছে, সুতরাং কিছু বাকি থাকলে তা পরে শেষ করা যাবে— এমন মানসিকতা ত্যাগ করে প্রতিনিয়ত পরিকল্পিত ভাবে পড়াশোনার মাধ্যমে কঠিনকে সহজ করাই বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার সহজ টেকনিক।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: কোচিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ? যাদের কোচিং করার সুযোগ নেই তারা কীভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে?
সোহাগ আলী: মানুষ স্বভাবতই অলস প্রাণী। কেননা প্রয়োজনের প্রত্যক্ষ ফল হাতে-নাতে না পাওয়া পর্যন্ত সেই বিষয়ে তারা তেমন মনোযোগী হতে চায় না, যতক্ষণ না তাকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। আর পড়াশোনার ব্যাপারে তো অবশ্যই না। যদিও হাতেগোনা কিছু ব্যতীক্রম আছে। তবে তার সংখ্যা নিতান্তই অমূলক।

সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মতো প্রতিযোগিতার জায়গায় অবশ্যই কোচিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেননা সেখানে একজন শিক্ষার্থীকে সেভাবেই গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়, যাতে সে সেই প্রতিযোগিতার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। এছাড়াও সেখানে অভ্যন্তরীন যে প্রতিযোগিতাগুলো হয় সেটাও ভর্তি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সুতরাং কোচিং গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কোচিং ছাড়া যে চান্স পাওয়া যায় না, এটাও ভাবা যাবে না। কেননা এটাও দেখা যায় যে প্রতিবছর অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষার্থী চান্স পায় যারা কখন কোচিং করেনি।

সুতরাং হতাশ না হয়ে এলাকার কিংবা পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বড় ভাই/বোন অথবা ভালো কোন শিক্ষকের পরামর্শ এবং লক্ষ্য জয়ে নিজের কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ভর্তি প্রস্তুতি নিতে হবে। তাছাড়া প্রযুক্তি এই সময়ে একটু চোখ কান খোলা রেখে গুগল-ইউটিউব থেকে সাহায্য নিয়েও যেকোন ভর্তি পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: গাইড বই নাকি পাঠ্য বই- কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
সোহাগ আলী: গাইড ও পাঠ্যবই দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কেননা গাইড বইগুলো মূলত, টেক্সটবইকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়। সুতরাং, আমি মনে করি, টেক্সটবইকে বেশী গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি গাইডবইগুলো অনুসরণ করা উচিত।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: যারা একই সাথে একাধিক ইউনিটের প্রস্তুতি নেয়, তাদের জন্য পরামর্শ কি?
সোহাগ আলী: নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি, একইসাথে একাধিক ইউনিটের প্রস্তুতি নিয়ে এ পর্যন্ত খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই সফল হয়েছে। সুতরাং যে ইউনিটে পরীক্ষা দিলে তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা সহজ হবে, সেটা নির্ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। কেননা জীবনে একবারই সুযোগ আসবে রাবির প্যারিস রোড কিংবা ঢাবির টিএসসিতে পাবলিকিয়ান পরিচয় দিয়ে বিচরণ করার। অতএব, যেকোনো একটাতে ফোকাস করাই শ্রেয়।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণকালে সাধারণত কোন ভুলগুলো শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দেয়?
সোহাগ আলী: ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালে যে ভুলগুলো শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দেয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কোচিং কিংবা প্রাইভেটে শিক্ষার্থীদের তিন মাসের ব্যর্থ প্রেম। কথাটা অন্যরকম শোনালেও এটা এক চিরন্তন সত্য। প্রতিবছর হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী অল্প সময়ের এই প্রেম-পিরিতির ফাঁদে পড়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন ব্যর্থ হচ্ছে। সুতরাং ভর্তি পরীক্ষার মতো এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই ফাঁদে পা না দেয়া এবং যে কোচিং/প্রাইভেটে এমন সুযোগ কম সেখানে প্রস্তুতি নেয়া।

এছাড়া অতিরিক্ত টেনশন ও অলাইন আসক্তি, বেশি রাত জেগে পড়াশোনা, মূল টপিক সম্পর্কে ধারণা না থাকা, বেহুদা টপিকে বেশি সময় নষ্ট করা, ভুল গাইডলাইন ইত্যাদি ভুলগুলো শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রাখে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতি সম্পর্কে আপনার পরামর্শ কি?
সোহাগ আলী: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যমত একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্নের একটি ক্যাম্পাসের নাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং ভর্তি যুদ্ধের অনেক জোরালো প্রতিযোগিতায় নামতে হয় দেশের ভর্তিচ্ছু হাজারো শিক্ষার্থীকে।

যেহেতু প্রতিযোগী অনেক বেশি, সেহেতু প্রস্তুতি অনেক ভালোভাবেই নিতে হবে। আর তার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন পদ্ধতি এবং পূর্ববর্তী প্রশ্ন কাঠামো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকতে হবে।

তাই রাবির বিগত দশ বছরের প্রশ্ন ব্যাংক, এমপি থ্রি ও বিসিএস প্রশ্ন ব্যাংকের পাশাপাশি সহায়ক বই গুলো পড়তে হবে যেগুলো কোচিংয়ে দেয়া হয়। তাছাড়া বাঠ্যবইয়ের উপর পুরো দখল থাকা চাই। আর এবছর যেহেতু শুধু বহুনির্বাচনি প্রশ্নের পরীক্ষা নেবে রাবি। তাই বিগত বছরের প্রশ্নগুলো দেখলে বুঝতে পারা যাবে রাবি কোন টপিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: পরীক্ষা চলাকালীন ১ ঘন্টা/দেড় ঘন্টায় কোন ভুল করা উচিত নয়?
সোহাগ আলী: এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। কেননা একজন শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি খুবই ভালো। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্ন পাওয়ার পর উত্তেজনাবসত ঘাবড়ে যায় অথবা অধিক আত্মবিশ্বাসের কারণে অসচেতনতাবসত নিজের রোল, রেজিষ্ট্রেশন অথবা সেট কোড ভুল করে ফেলে। যার ফলে হাতছাড়া হয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়।

এছাড়াও প্রশ্ন কমন পড়লে তাড়াহুড়ো করে উত্তর করতে গিয়ে ভুল করে বসে অনেকে। সুতরাং পরীক্ষার হলে এই এক থেকে দেড় ঘন্টায় কোনভাবেই ভুলগুলো করা যাবে না। কেননা এই সময়টুকুর উপরই একজন শিক্ষার্থীর পাবলিকিয়ান হওয়ার স্বপ্ন নির্ভর করে।

অতএব ঘাবড়ে যাওয়া কিংবা ওভার কনফিডেন্স না হয়ে ঠান্ডা মাথায় সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্রটি ভালোভাবে অন্তত একবার পড়া। তারপর যথাসম্ভব শান্ত হয়ে আগে কমন প্রশ্নের উত্তর করা। তারপর অপেক্ষাকৃত কম কঠিন প্রশ্নগুরো নির্বাচন করে উত্তর করার চেষ্টা করা এবং সর্বশেষ কঠিন প্রশনের উত্তর করার চেষ্টা করা।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: প্রথমবার যারা ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে তাদের মাঝে ভয় বেশি কাজ করে এবং এর ফলে অনেকেই ব্যর্থ হয়। এই ভয় দূর করার ক্ষেত্রে করণীয় কি?
সোহাগ আলী: ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকরীদের ৯৫% শিক্ষার্থী প্রথম পরীক্ষা দিয়ে থাকে। সুতরাং ভয়ের কোন কারণ নেই। সুতরাং সর্বদা মাথায় রাখতে হবে, আমি একা নই বরং আমার মত আরও অনেকে আছে যারা প্রথম বার পরীক্ষা দিচ্ছে। তাই এই দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এই আত্মবিশ্বাস আনতে হবে যে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের জন্য এতো দিনের যে ত্যাগ, আজই তার অগ্নি পরীক্ষা। অতএব যতকিছুই হোক না কেন একটা সিট আমার ধরে রাখতেই।

তাছাড়া বেশি বেশি মডেল টেস্টের পাশাপাশি অনলাইন কুইজ দিয়ে নিজেকে যাচাই করাও পরীক্ষায় হলে ভীতি কমিয়ে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে পারে বলে মনে করি। সুতরাং সর্বোচ্চ পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি তাকদিরে বিশ্বাস রাখতে হবে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।
সোহাগ আলী: আপনাকেও ধন্যবাদ।


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ