পরিকল্পিত পরিশ্রম আর নিরন্তর প্রচেষ্টাই সাফল্যের মূলমন্ত্র

পরিকল্পিত পরিশ্রম আর নিরন্তর প্রচেষ্টাই সাফল্যের মূলমন্ত্র
  © টিডিসি ফটো

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) সহকারী অধ্যাপক সজীব ত্রিপুরা। অধ্যাপনার পাশাপাশি সহকারী প্রক্টর ও হাউজ টিউটর পদেও নিয়োজিত রয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন সজীব ত্রিপুরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা ব্যুরোতে ‘এসিস্টেন্ট প্রোগ্রামা’ পদে চাকরি করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে অবশেষে শিক্ষকতা পেশাকে বেঁচে নিয়েছেন তিনি। ছাত্র জীবনের নানান স্মরণীয় ঘটনা, শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নিয়ে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস’র সঙ্গে কথা বলেছেন সজীব ত্রিপুরা। তুলে ধরছেন রাবিপ্রবি প্রতিনিধি আহ্সান হাবীব-

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  ছাত্র জীবনের স্মরণীয় কিছু ঘটনা?
সজীব ত্রিপুরা: আমার পুরো জীবনটায় সংগ্রামের। তবে স্কুল জীবন ছিল আরও একটু চ্যালেঞ্জের। কৃষক পরিবার হওয়ায় ভোরে উঠে বাবার সাথে জমিনে আইল কাটতে, হাল মারতে, ধান লাগাতে যাওয়া অথবা জুমে ধান কাটতে, হলুদ তুলতে যাওয়া, বন্য শুকরের ধ্বংসের হাত থেকে জমিনের পাকা ধান রক্ষার্থে শীতের রাতে পাহাড়া দিয়ে গাইরৈং–এ ঘুমাতে যাওয়া ইত্যাদি শেষে স্কুলে যাওয়া আবার স্কুল থেকে ফিরে এসে জমিনে ধান লাগাতে বা জুমে কাজ করতে চলে যাওয়া। মাচাং ঘরে বা মাটির ঘরে চেয়ার টেবিলবিহীন চট বিছিয়ে দুর্বল শরীরে পড়ালেখা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়া। আইল কেটে বাধান লাগিয়ে হাটু পর্যন্ত গরু চলাচলের গ্রামের মেঠোপথ দিনে তিন কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে স্কুলে পৌঁছলে সহপাঠীরা অনেক সময় বলে দিত আমার কানে-ঘাড়ে কাদা লেগে আছে। এছাড়া ছুটির দিন ছাড়াও স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে মহিষ চড়াতে যেতে হত প্রায়ই। কলেজ জীবন ছিল অনুভবের। গাজীপুরের “বাংলাদেশ এডভেন্টিস সেমিনারি এন্ড কলেজ (বাস্ক) মিশন”। আজও দেখতে পাই। আজও খুব ভালো লাগে। বাস্ক কথাটি মনে পড়লে কিছুক্ষের জন্য হারিয়ে যাই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল জনসেবার। সম্পুর্ণ সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন “ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম”–এর কেন্দ্রীয় সদস্য হওয়ায় জাতির ক্রান্তি লগ্নে সামাজিক দায় বোধ নিয়ে পৌঁছে যায় প্রত্যন্ত দুর-দুরান্তে সহযোগিতার তাগিদে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  সংস্কৃতিকে কিভাবে মুল্যায়ন করেন? একটি দেশের সংস্কৃতিকে কিভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা যায়? আমাদের ভুমিকা কি হওয়া উচিত?
সজীব ত্রিপুরা: সংস্কৃতি প্রত্যেক জাতির পরিচয়। প্রত্যেক জাতির গর্ব। বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। এটাকে সম্মানের সাথে বাঁচিয়ে রাখা, পরিচর্চা করাও বিশ্বের মানুষের সামনে তুলে ধরা দরকার।আজকাল প্রযুক্তি আমাদের সব সহজ করে দিয়েছে। শুধুমাত্র একটা ক্যামেরা, একটা কম্পিউটার ও ইন্টারনেট থাকলেই যথেষ্ট। আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আমাদের ত্রিপুরাদের মর্যাদা পুর্ণসংস্কৃতি নিয়ে বিরতিহীন কাজ করে আসছি। ইউটিউবে রয়েছে আমার প্রথম পরিচালিত এবং বাংলাদেশের প্রথম ত্রিপুরা ভাষায় চলচ্চিত্র “পাইতাউডি (বিশ্বাসকর)”, দ্বিতীয় চলচ্চিত্র “প্লকমাগ্লাক (ভুলে যেতে পারবনা)” এবং রিলিজ হবে শীঘ্রই “তাক্রিদি (ভয়পেয়োনা)”। এগুলো সম্পূর্ণ ত্রিপুরা জাতির সংস্কৃতি নিয়েই নির্মিত।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  আলাদিনের চেরাগ হাতে পেলে আপনার অপূরণীয় কোন ৩টি ইচ্ছা পূরণ করতে চান?
সজীবত্রিপুরা: খুবই মনের মত একটা ভালো প্রশ্ন। আলাদিনের চেরাগ হাতে পেলেআমার প্রথম ইচ্ছা- ক্যান্সার ও এইচআইভি’র প্রতিষেধক/ঔষধ আবিষ্কার করে ফেলতাম; দ্বিতীয়ত-আমার নামকে সর্বকালের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিখ্যাত করতাম; আর তৃতীয়ত-বিশ্বকে রাজনীতিমুক্ত করতাম।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: মহামারির এইদিনগুলো কিভাবে পার করছেন? এই সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?
সজীব ত্রিপুরা: গ্রামের বাড়ি সিন্দুকছড়িতে গিয়ে মা-বাবা, ভাই-বোন ও ভাতিজা-ভাতিজীদের যত্ন নেওয়া, একসাথে আড্ডা দেওয়া, দুষ্টুমি করা, মুভি দেখা, খাঁচা বানিয়ে নানান গাছের চারা লাগানো, ধান লাগানোতে সহযোগিতা করা, ত্রিপুরা ভাষার অভিধান ও শব্দ ভান্ডারের এপস তৈরি করা,ঘরের খুঁটি নাটি কাজ করা, ভিডিও এবং সাউন্ড এডিটিং করা, গান লেখা, গবেষণাপত্র পড়া ও লেখা, অনলাইন অফিসিয়াল মিটিং করা, অফিসিয়াল কাজের জন্য বিশেষ অনুমতি নিয়ে ৫ গুণ ভাড়া দিয়ে রিজার্ভ গাড়িতে পুর্ণ প্রোটেকশনে রাঙ্গামাটিতে আসা, অফিস করা, আবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া। মহামারির এইদিনগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে- শুধু ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জারে কথা বলা, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউবে নাচ-গান-চলচ্চিত্র ইত্যাদির ভিডিও দেখায় অযথা বেশি সময় নষ্ট না করে বরং গুগল ও ইউটিউব থেকে অজানা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষনীয় বিষয়গুলো শিখে নেওয়া। যেমনটা আমি শিখে নিয়েছি- বিভিন্ন এপ্স তৈরি, ওরাকল ও স্কোয়ালাইট ডাটাবেইজ তৈরি, ভিডিও ও অডিও এডিটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন এবং গবেষণার বিভিন্ন বিষয় ইত্যাদি।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  প্রিয় লেখক কে? কোন কোন লেখা অনেক ভালো লাগে?
সজীব ত্রিপুরা: ডেল কার্ণেগী ও শিব খেরা। অনুপ্রেরণামুলক লেখাগুলো অনেক ভালো লাগে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  আপনার কাছে শিক্ষা ও জীবনের মানে কি?
সজীবত্রিপুরা: ছোট কালে মা-বাবাদের মুখে একটা কথা শুনতাম- “ম-ককংগ্নাং/ ম-ককব্রৈগ্নাং (চোখনাকওয়ালা/ চারটা চোখ ওয়ালা)”  অর্থাৎ দেখতে ও শুনতে পায় বা সাধারণ মানুষের চেয়ে আরো একটু গভীর ভাবে দেখতে ও শুনতে পায়। আমার কাছে শিক্ষা হচ্ছে এটাই যে সাধারণ মানুষের চেয়ে আরো একটুন্যায়, স্বচ্ছ, গভীরভাবে মুল্যায়ন ও বিচার করার সাহস জোগায়। আমার কাছে জীবন মানে– যেখানে যে অবস্থায় অবস্থান করুক না কেন নিজের অধিকার, সংস্কৃতি ও পুর্ণ মর্যাদা নিয়ে জীবন যাপন করতে পারা। সুস্থ শরীর ও মস্তিষ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে পারা।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: রাবিপ্রবিকে নিয়ে আপনার স্বপ্ন! নতুন কোন পরিকল্পনা আছে কি?
সজীব ত্রিপুরা: রাবিপ্রবিকে নিয়ে আমার স্বপ্ন হচ্ছে– এই বিশ্ববিদ্যালয় একদিন বিশ্বমানের একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করবে। সুশিক্ষা পাবে অত্র প্রত্যন্ত এলাকারও দেশের গরীব-দুঃখী মেধাবী ছেলে-মেয়েরা। নতুন পরিকল্পনা অবশ্যই আছে- সেটা হচ্ছে আমার শিক্ষার্থীদের দিয়ে এমন কিছু উদ্ভাবন করানো যেটা দিয়ে বিশ্বের সাধারণ মানুষের উপকার হয় এবং রাবিপ্রবি’র নাম বিশ্বের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
সজীব ত্রিপুরা: বিখ্যাত মানুষ হয়ে আমার নাম বিশ্বের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখানো।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার জীবনের বেদনাদায়ক একটি ঘটনা যা আপনাকে আজো কষ্ট দেয়?
সজীব ত্রিপুরা: একটি ক্যান্সার রোগ যা আমার সুদর্শন ও সুন্দর মনের অধিকারি দুই মেজ ভাইয়ের জীবন কেড়ে নিয়েছে। যার ঔষধ আবিষ্কারের জন্য আমি হন্যে হয়ে ২০০৬ সাল থেকে এলোপ্যাথি-হোমিওপ্যাথী-আয়ুর্বেদ-ভেষজ-বৈদ্য-বনাজি-গুগলপ্যাথী-ইউটিউব প্যাথী বিশ্বকে ঘুরতে হয়েছে। অবশেষে গত জুন-২০২০ সালে সফল হলাম। খুব কম দামি আর হাতের কাছে রয়েছে যা কোটি কোটি গরীব-দুঃখী মানুষের জীবন বাঁচাবে এই মরণব্যাধির হাত থেকে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  বাংলাদেশে অনলাইন ক্লাসের ভবিষ্যত ও সম্ভাবনা নিয়ে কিছু বলেন?
সজীবত্রিপুরা: সবার চেষ্টা থাকলে এটা সম্ভব যদি ক্লাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সিকিরিটি সম্পন্ন অনলাইন পরীক্ষা নেওয়ার ক্লাউড বেইজ ডাটাবেইজ সফটওয়ার উদ্ভাবন করা যায় এবং দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎও মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট স্বল্পমূল্যে সংযোগ নিশ্চিত করা যায়।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  ১০ বছর পরে রাবিপ্রবির স্বপ্ন? (সম্ভাবনা ও কার্যক্রম)
সজীব ত্রিপুরা: গত ২৬-০৭-২০২০ইং তারিখে রাবিপ্রবি’র ২০১৯-২০২০শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ওরিয়েন্টেশন ক্লাসের সময় বক্তৃতা কালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আগামী বছরের প্রথম দিকে রাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে রমেগা প্রজেক্টের কার্যক্রম শুরু হতে পারে।সে অনুসারে যদি বলতে যায় তাহলে ১০ বছর পরে আমাদের রাবিপ্রবি একটা স্বয়ং সম্পুর্ণ ক্যাম্পাস পেতে পারে। আর তত ক্ষণে হয়ত আমার ছাত্র-ছাত্রীরাই নিজের ক্যাম্পাসে নিজেদের যোগ্যতা বলে শিক্ষক-কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ লাভ করে নিজেদের ক্যাম্পাসকে নতুন উদ্যোগে বিশ্বের মানসম্পন্ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে নিয়োজিত হতে পারে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস:  আপনার জীবনে আদর্শ কি?
সজীব ত্রিপুরা: আমাদের এলাকায় সবচেয়ে প্রাচীন গোষ্ঠী হচ্ছে আমার দাদুরা। আমার দাদুদের দাদুরাই সর্ব প্রথম সিন্দুকছড়ি এলাকায় গোড়াপত্তন করেন। এখনো এলাকার বেশির ভাগ জায়গা জমি আমার দাদুদের (পূর্বপুরুষ)।এলাকায় জমিদার শব্দটি চালু নাই তবে মহাজন শব্দটি চালু রয়েছে। তাই বর্তমানে এলাকার বেশির ভাগ পাড়ার নাম আমার দাদুদের নামে- যেমন সুকান্ত মহাজন পাড়া, রথেচন্দ্র মহাজন পাড়া ইত্যাদি। গর্ব করে বলতে পারি আমাদের বংশের একমাত্র আদর্শ হচ্ছে যা সম্ভব মানুষের উপকার করা, কারও কোন প্রকার ক্ষতিনা করা, কারোর সাথে ঝামেলায় না জড়ানো, সবার সাথে ন্যায় সংগত আচরণ করা। বংশ পরম-পরায় রক্ত ধারা অনুসারে আমার আচরণে ও তাই দেখতে পাই। নিঃসন্দেহে বলতে পারি আমার এক মাত্র আদর্শ ও কেবল মানুষের উপকার করা, কারও কোন প্রকার ক্ষতি না করা।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য।
সজীব ত্রিপুরা: দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ