০৪ মার্চ ২০২৩, ০৮:৩৫

আরো কয়েকটি বিদেশি ভাষার পাঠদান শুরু হচ্ছে ভাষা ইনস্টিটিউটে

ড. এবিএম রেজাউল করিম ফকির  © টিডিসি ফটো

অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির একজন অধ্যাপক। তিনি ১৯৬৩ সালের ৩১ জুলাই ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার রূপসী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

তিনি মূলত একজন ভাষা ও সংস্কৃতি গবেষক। তিনি ভাষা বিজ্ঞান, সমাজ ভাষা বিজ্ঞান, নৃ-ভাষা বিজ্ঞান, ভাষা আয়ত্ত্বকরণ বিজ্ঞান, ভাষানীতি বিজ্ঞান ও তান্ত্রিক রাজনীতি বিজ্ঞানের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে গবেষণায় ব্যপৃত রয়েছেন।

তিনি তাঁর গবেষণা লব্ধ ফলাফলের বিষয়বস্তু নিয়ে অসংখ্য গবেষণা সন্দর্ভ রচনা করেছেন। তাঁর গবেষণা লব্ধ ফলাফলসমূহ বাংলা, জাপানি ও ইংরেজি পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে থাকে। সম্প্রতি গুণী এ ব্যক্তিত্ব মুখোমুখি হয়েছেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের। তার কথাগুলো শুনেছেন তাওফিকুল ইসলাম হিমেল

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বছরের কোন কোন সময়ে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাবর্ষ হলো জুলাই-জুন পর্যন্ত। কাজেই এই শিক্ষাবর্ষকে লক্ষ্য রেখে সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চের দিকে ভর্তি কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে করোনাভাইরাস বিস্তৃতির কারণে আমাদের বিগত কয়েক বছর সেভাবে নির্দিষ্ট সময় অনুসরণ করে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনি নিশ্চিয়ই জেনে থাকবেন, ভর্তি ফি নিয়ে অনেক ভর্তিচ্ছুর একটা অভিযোগ রয়েছে। আপনারা অতিরিক্ত ফি নেন। এটা কি সত্যি?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আসলে আমি এই  ইনস্টিটিউটের  পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনও ফিস বৃদ্ধি করা হয়নি। আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগে ভর্তির ফিস বৃদ্ধি হয়েছে, তা নিয়ে মন্তব্য করব না। তবে আমি কোনভাবেই অতিরিক্ত ফিসের পক্ষে নই।  যদি সত্যিই ভর্তি ফিস বৃদ্ধির মতো কিছু হয়ে থাকলে, সে বিষয়ে নজরে রেখেছি।  

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর প্রায় যেকোনো ভাষায় ভর্তির সুযোগ রয়েছে। তবে শুধুমাত্র ইংরেজি ছাড়া। ইংরেজি কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হলো?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আমাদের এই  ইনস্টিটিউটে ইংরেজি ভাষা রাখা আসলে ঠিক নয়। কারণ ইংরেজি ভাষা চর্চার জন্য বিভিন্ন ভালো ভালো কলেজ রয়েছে। এসব কলেজগুলোতে ইংরেজি ভাষাটা ভালোভাবে শিক্ষা দিলে আমাদের উপর চাপটা কমে আসবে। এতে করে আমরা বিদেশি ভাষা শিক্ষাকার্যক্রমের উপর ভালোভাবে নজর দিতে পারবো। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।

শুধুমাত্র অনেক দিনের ঐতিহ্যের কারণে আমার মনে হয় এ ইনস্টিটিউটে এখনো ইংরেজি ভাষাকে ধরে রাখা হয়েছে। আমার মনে হয়, এই বিভাগে এটার বর্তমানে আর কোন প্রয়োজন নেই। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: একাডেমিক পাঠদানে কীভাবে এখানকার শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আমাদের এখানে ভাষা শিক্ষার চারটি দক্ষতাকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এগুলো হল বাচন, শ্রবণ, লিখন ও পঠন। এসব দক্ষতার উপর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরসঙ্গে ব্যাকরণ ও শব্দ ভান্ডার অজর্নের উপর পরীক্ষা নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: গুগল ট্রান্সলেটে চাটগাঁইয়া ভাষা যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সত্য নয়

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: দেশ-বিদেশে আপনাদের দেওয়া সার্টিফিকেটের কদর কেমন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আমরা যে দক্ষতা ভিত্তিক পরীক্ষাগুলো নিয়ে থাকি, সেগুলোর বেশ কদর রয়েছে। দক্ষতাভিত্তিক পরীক্ষা বলতে পরীক্ষায় ৪টি দক্ষতাকে মূল্যায়ন করাকে বুঝাচ্ছি।

আমাদের প্রতিষ্ঠানের সুনাম নির্ভর করে আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন ভাষাগত দক্ষতার পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করে এবং শিক্ষার্থী বিদেশ গমন করতে পারে তার ওপর।

জাপানি, কোরিয়ান, চীনা, জার্মান, ফরাসিসহ আরো অন্যান্য দেশে যেতে হলে ভাষাগত পরীক্ষা দিতে হয়। সেই দেশগুলো যখন তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়; সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে এবং খুব ভালো ফলাফল করে থাকে। যার কারণে আমাদের খুব ভালো সুনাম রয়েছে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: এখানে কয়টি ভাষায় আপনারা পাঠদান করছেন? এসব ভাষার শিক্ষক হিসেবে কারা রয়েছেন
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আমাদের এখানে সর্বমোট ১৪টি ভাষায় পাঠদান করা হয়ে থাকে। তাছাড়া মালয় এবং পর্তুগিজ আরও দুইটি বিভাগ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের বেশকিছু বিদেশি শিক্ষক রয়েছেন। আমাদের কিছু অতিথি শিক্ষকও রয়েছেন। অতিথি শিক্ষকদের অনেকেই দেশের বাইরের। এছাড়া যারা বাংলাদেশি শিক্ষক রয়েছেন তারা বিদেশ থেকে ডিগ্রী অর্জন করে এসেছেন।

আরও পড়ুন: 'ইংরেজি ভাষায়' বাংলা ভাষা শহীদদের স্মরণ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনাদের সিলেবাসে নতুন যুক্ত হতে যাওয়া দুইটি ভাষা সম্পর্কে বলুন
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: পর্তুগালের ক্যামিওস ইনস্টিটিউট নামে ভাষা ও সংস্কৃতি কার্যক্রম বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। তাদের সহযোগিতায় এখানে আমরা পর্তুগীজ ভাষা পাঠদান করবো।

আর মালয়েশিয়ার সুলতান ইদ্রিস পেনডিডিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আমরা খুব শিগগিরই মালয় ভাষাও এখানে চালু করব।

আমাদের এখানে ১৪টি ভাষার মধ্যে চারটিতে অনার্স এবং মাস্টার্স রয়েছে, বাকি দশটিতে অনার্স-মাস্টার্স নেই। আমাদের আরো কয়েকটি বিদেশি ভাষায় ডিগ্রি শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার ইচ্ছা আছে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মান, রুশ স্পেনিশ ও হিন্দি। কোনও ভাষা বাদ দেওয়ার কথা বলতে গেলে, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ইংরেজি ভাষার বিষয়ে হয়তো কোন একটি সিদ্ধান্ত হতে পারে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ভাষা নিয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে কেমন গবেষণা হয়?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আমাদের এখানে যত জন শিক্ষক রয়েছেন তাদের মধ্যে প্রত্যেকেরই কমবেশি গবেষণা রয়েছে। আমাদের ১৯৮৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত একটানা প্রতি বছরই জার্নাল প্রকাশিত হয়। তাই, আমরা বলতে পারি আমাদের এখানের গবেষণা কার্যক্রম অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে তুলনামূলক ভালো।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: বাঙালির ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি বিদায় নিয়েছে। এ মাসে ভাষা ইনস্টিটিউট কি কি কর্মসূচি পালনে করেছে?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: এখানে ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এক সপ্তাহব্যাপী বাংলাসহ বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পুরো ইনস্টিটিউট বর্ণিল সাজে সাজিয়েছি। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলা ভাষা, তাদের শ্রদ্ধায় এবং তাদের স্মরণে আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছি।

আরও পড়ুন: ৯ ভাষা কোর্সে জাবিতে পড়ার সুযোগ, প্রতি কোর্সে আসন ৪০টি

‘বিশ্বায়নের যুগে বিদেশী ভাষা জানা ও অধ্যায়নের গুরুত্ব-এই শিরোনামে আমরা একটি সেমিনার আয়োজন করেছি। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমাদের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান এবং এখানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের প্রধান অধ্যাপক ডক্টর হাকিম আরিফ। সেখানে আমি প্রবন্ধকার হিসাবে প্রবন্ধ পাঠ করেছি।

২৭ ফেব্রুয়ারি আমাদের আরও একটি সেমিনার হয়েছে। যেটা ছিলো অনুবাদের স্বরূপ এবং সম্ভাবনা বিষয়ে। যেখানে প্রবন্ধকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় জার্মান ভাষা শিক্ষক ডক্টর দেবব্রত চক্রবর্তী।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনি জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির একজন অধ্যাপক। জাপানি ভাষাকেই কেন বেছে নিলেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলাম। সেসময় জাপানি ভাষা একটি নন ডিগ্রী প্রোগ্রাম ছিল। আমাদের সেই সময় জাপানের উন্নয়নের গল্প প্রচলিত ছিল। আমেরিকা কর্তৃক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের ক্ষেত্রে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিন্তু জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশসমূহ মিলে গঠিত মিত্র শক্তিকে এশিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বহিষ্কার করে দেয়। এ ঘটনাটি আমার হৃদয়ের গভীর থেকে ভালো লেগে যায়। সেই ভালো লাগা থেকে আমি জাপান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। তখন এখানে চার বছরব্যাপী  উচ্চতর ডিপ্লোমা ছিল; যেটা আমি অর্জন করি। পরবর্তীতে জাপানে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করি। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের জন্য অনেক ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন।
অধ্যাপক ড. এ বি এম রেজাউল করিম ফকির: দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের জন্যেও রইলো অনেক শুভকামনা।