১৫ এপ্রিল ২০২০, ১৩:০১

পিপিই ছাড়াই চিকিৎসা করেন ডাক্তার মঈন, ছাত্রের স্ট্যাটাস ভাইরাল

দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে প্রথম একজন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। ওই চিকিৎসক সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজের একজন সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আগে ঝুঁকি নিয়ে পিপিই ছাড়াই চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন তিনি। তখন এই ঝুঁকির বিষয়টি জানিয়ে তার এক ছাত্রের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথনের এমনই দুটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

পরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আসার জন্য আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য ওই ছাত্রকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া হাসপাতালে কিছু পিপিই থাকলেও তা বেশি ঝুঁকিতে থাকা জুনিয়র সহকর্মীদের সরবরাহ করেছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আহমাদুল্লাহ নামে একজন লিখেছেন, মঈন স্যার, কতটুকু অভিমান নিয়ে চলে গেলেন, জানি না। আপনার সম্পর্কে যতটা শুনেছি, তাতে শেষবেলায় অভিমানের কোন কথা ছিলো না। স্যাচুরেশন যখন নামছিলো, বিড়বিড় করে তখনও হয়তো সহকর্মীদের আশীর্বাদ করে গেছেন, চিরপরিচিত হাসিতেই হয়তো ক্ষমা করে গেছেন আপনার প্রতি সব অবিচার।

কিন্তু, আমরা তো আপনার মত মহৎ হৃদয় নই, স্যার। আপনার বুকে যতটুকু ভালোবাসা ছিলো, আমাদের বুকে ঠিক ততটাই ক্ষোভ কাজ করে। সে ক্ষোভের আগুন বড়ই অদ্ভুত- চোখের অশ্রুতে নেভে না, আরো দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে।

জানেন স্যার, ডিএমসিয়ান শব্দটা শুনলেই আগে বড় আপন মনে হত। আপনাকেও ভালোলাগার শুরুটা এই শব্দেই। কিন্তু, আজ আর অনুভূতি গুলো কাজ করে না। বকবেন না স্যার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আর গণভবনের ওই ডিএমসিয়ানকে আমি আর কোনদিনই আপন ভাবতে পারব না।

আপনি মেডিসিনের শিক্ষক ছিলেন। বহু ছাত্রকে ভেন্টিলেটর, আইসিইউ শব্দগুলো আপনিই প্রথম শিখিয়েছিলেন। সেই আপনাকে ভেন্টিলেটর না দিয়ে যেদিন বলা হলো, ‘আপনি শখের বসে ঢাকায় যেতে চান’, সেদিনও কি চোখের অশ্রুগুলোকে একবুক হিমবাহতেই লুকিয়ে রেখেছিলেন?

এই সেদিনই মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার আনন্দে ভরদুপুরের তপ্ত রোদে র‍্যালি করতে বাধ্য করা হয়েছিলো আপনাকে। সেদিন কি ভাবতে পেরেছিলেন, রাষ্ট্রীয় খরচে পদ্মা সেতু নির্মাণের এই দেশে একটি সরকারি অ্যামবুলেন্সও আপনার কপালে জুটবেনা?

শুনেছি, আপনি অনেক দূরদর্শী ছিলেন। এ সবই হয়তো জানতেন, তবুও একরাশ স্বপ্ন নিয়েই লড়ে যেতে চেয়েছিলেন।আপনি ভুল করেছিলেন, স্যার। আপনি জানতেন না, স্বপ্ন দেখাটাই এদেশের সবচেয়ে বড় পাপ।

আপনি হয়তো হাসছেন। পাপ করেও যদি স্বর্গে ঠাঁই হয়, সে পাপই তো আজন্ম সার্থকতা। আপনার জীবন থেকে অভিমান, ক্ষোভ, অপ্রাপ্তি- শব্দগুলো হয়তো বিলীন হয়ে গেছে। একজীবনের মূল্য দিয়ে অনন্তজীবনের পথে পাড়ি জমিয়েছেন আপনি। কিন্তু, আমাদের হৃদয়ে যে হাহাকার জাগিয়ে গেলেন, সেই অপ্রাপ্তির গল্পের খলনায়কদের আমরা কোনদিনই ক্ষমা করতে পারব না।

"আলোর মিছিলে তুমি সামনে ছিলে,
কেউ না জানুক, আমি জানি।
মৃত্যকে দু-হাতে কাছে টেনে নিলে,
অভিমান ছিলো কতখানি?

মহাকালে ঠাঁই নাও, মুক্তির গান গাও
বাতিঘর হয়ে থাকো দুর্দিনে।
সব জরা ঘুচে গেলে, রাত শেষে ভোর এলে,
সুর তুলো আলোকের সন্ধানে।"

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফয়সাল আকবর নামে আরেকজন লিখেছন, ডা. মঈন উদ্দিন ভাই শাহাদাত বরণ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর ছাত্রের কাছ থেকে পাওয়া এই দুটি ছবি অনেক কথাই প্রকাশ করে দেয়। মহান রবের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই মানবিক ডাক্তারকে শহীদী মর্যাদা দান করেন, আমীন!

তার বয়স ছিল ৫০ এর কাছাকাছি। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে হাসপাতালের উপ-পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবিএম বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে তিনি আমাদের এখানে এসেছিলেন। গত তিন দিন তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। রেসপিরেটরি ফেইলিওরের কারণে আজ তার মৃত্যু হয়। ওই চিকিৎসকের নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হয় গত ৫ এপ্রিল। এরপর থেকে তিনি সিলেট শহরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় নিজের বাসায় আইসোলেশনে ছিলেন।

শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় ৭ এপ্রিল রাতে তাকে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিলেটে এই হাসপাতালেই কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তার ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে। পরদিন বিকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।


গত সপ্তাহে সিলেট থেকে ঐ চিকিৎসককে ঢাকায় নিয়ে আসার খবরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয় গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায়।

ওসমানী মেডিকেলের ওই চিকিৎসকই সিলেটে শনাক্ত হওয়া প্রথম কোভিড-১৯ রোগী। কীভাবে তিনি সংক্রমিত হলেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশ করেনি। মেডিসিন ও হৃদরোগের চিকিৎসক ওই সহকারী অধ্যাপক সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতালেও নিয়মিত রোগী দেখতেন।