১০ এপ্রিল ২০২০, ১৫:২০

বাড়িতে সারাজীবনই কোয়ারেন্টাইন জীবন পার করেছি

  © প্রতীকী ছবি

চীন থেকে উৎপত্তি প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে কাঁপছে দুনিয়া। কলকারখানা, সড়ক, অফিস যাবতীয় ব্যস্ততাকে এবার ছুটি দিয়েছে একসাথে পুরো দুনিয়ার মানুষকে। যেনো থমকে গেছে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সবকিছু। প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম কৌশলের প্রয়োগ করতে গিয়ে ব্যস্ততম মানুষগুলোকে ঘরে রাখতেই ব্যস্ত রাষ্ট্রের শাসকরা। কিন্তু সে অখণ্ড অবসর তো দু-দিনেই শেষ হবার না, কবে কোথায় গিয়ে থামবে তারও লক্ষণ নেই।

করোনার বিস্তার ঠেকাতে মানুষকে ঘরে রাখার প্রক্রিয়াকে ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ বলা যায়। বাইরে অকারণে ঘোরাঘুরি করলে পুলিশ এখন ‘হোম কোয়েরেন্টাইনে’ রাখার শাস্তিও দিচ্ছে। ঘরে প্রিয়জনের সাথে অবসর সময় কাটানো যতোটা আয়েসের এ কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো উল্টো দিকে ততোটা বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।

পুঁজিবাদের বিকাশে আত্মকেন্দ্রিক উন্নয়নের হিড়িকে একান্নবর্তী পরিবার সে কবেই ডাইনোসরের রূপ নিয়েছে। একান্নবর্তী ভেঙে একক হয়ে উঠা পরিবার গুলোতে অখণ্ড এ বন্দীজীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারলেই বাঁচা অবস্থা মানুষের মধ্যে। কিন্তু যাদের পরিবারে ভাইবোন নেই। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। সেখানকার অভিজ্ঞতা আরো তিক্ত। সে অভিজ্ঞতার কথা সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন সাদিকা রহমান। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। তার অনুভূতি-অভিজ্ঞতা দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল...

কী কোয়ারেন্টাইন জীবন খুব অসহ্য লাগছে? একটু আমার গল্পটা শুনবেন? আমি একা। হ্যাঁ, আমার কোনো ভাই-বোন নেই। ছোট বেলা থেকে স্কুল জীবনের বাইরে মেলামেশার তেমন কোনো সাথীও ছিলনা। বলতে গেলে বাড়িতে সারাজীবন একপ্রকার কোয়ারেন্টাইন জীবনই পার করেছি, এখনো করি। ইদে সবার বাড়ি যখন ভাই বোনের আগমনে গিজ গিজ করে, আমাকে তখন একা-একাই শুয়ে বসে দিন কাটাতে হয়। স্পেশাল দিন বলতে কোনোদিন নেই আমার।

জানেন তো কাউকে একটু আপন করে পেলেই সারাদিন বকবক করে তার মাথা ধরিয়ে দেই। কিংবা অল্পতেই অনেক বেশি বিশ্বাস করে সমস্ত মনের কথা ঢেলে বলি। আর সেই সময়...তার তো ১২ টা বাজিয়েই ছাড়ি।

আমার মনে হয় কি জানেন আমার মতো মেয়েদের বিয়ে করে কোনো ছেলে হয়তো কখনো সুখী হতে পারবেনা।সারাজীবন গল্প করলেও মনে হয় আমাদের গল্প ফুরোবে না, আর জীবন সঙ্গী হলে তো কথাই নেই। কারণ আমরা আর কিছু চাই বা না চাই; অতিরিক্ত সময় চাই যা সবার জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। বেচারার হয়তো সারাজীবন নিজের কপালকে দোষরোপ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

কি করবো বলেন, ছোট বেলায় তো নামাজ কি জিনিস বুঝার আগেই শুধু উঠবস করে আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে একটা ভাই-ই চাইতাম। কিন্তু সেই নিষ্পাপ শিশুর কথা আল্লাহ তো আজও শুনলোনা। একটা ভাইয়ের বড্ড শখ ছিল আমার। ভাই কেনো বোনও পেলাম না। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা ভাই অথবা বোন হলে হয়তো আমার জীবনটা একটু অন্যরকমই হতো, হয়তো একটু বেশিই স্মৃতিময় হতো। অপু-দূর্গার মতো উপন্যাসের পাতায় ঠাই হলেও হতে পারতো। মাঝে মাঝে কল্পনা করি আমি একটা ছোট ভাই থাকলে তাকে কীভাবে শাসন করতাম, একটু বেশিই থাপড়াতাম আবার ভালোও বাসতাম হয়তো অনেক। এসব ভাবতেই কি যে মজা লাগে আমার!

জানেন আমারো মাঝে মাঝে, না না মাঝে মাঝে নয় সবার থেকে একটু বেশিই অসহায় লাগে। মনে হয় এই পৃথিবীতে বাবা মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমার জন্মটা না হলে কি এমন ক্ষতি হতো? একটু কষ্ট শেয়ার করে, কারো কোলে মাথা রেখে কান্নার উপায়টাও নেই। ভাই-বোন ছাড়া জীবন বড়ই অসহ্য। ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি নেই। সবসময় এক অস্থিরতা।

যাদের অনেকগুলো ভাই বোন আছে তারা সত্যিই অনেক লাকি আমি মনে করি। তারা চাইলেও কখনো ভাই-বোনহীন মানুষের জীবনটা উপলব্ধি করতে পারবেন না। কখনো হয়তো খুনসুটিতে নিজের ভাই বা বোনটিকে অসহ্য মনে হয়, কিন্তু আমার যে সেই অসহ্য অনুভূতি দেয়া-নেয়ার মানুষটিও নেই। অনেক অনেক ভালোবাসার মানুষ থাকা সত্ত্বেও আমি যে ভীষণ একা...