১৬ মার্চ ২০২০, ১৩:৫৫

চায়না যেভাবে করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করছে

  © সংগৃহীত

চীনের উহান প্রদেশে যখন প্রথম করোনা ভাইরাসে কেউ শনাক্ত হয়েছে বলে জানতে পারি, সেটা বছরের শুরুর দিকে। অফিসের চাইনিজ সহকর্মীরা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে পুরো জানুয়ারি পর্যন্ত মূলত অনেকটা ‘রিলাক্স মুডে’ চলে যায়। ক্রিসমাস, ইংরেজি নিউ ইয়ার এবং জানুয়ারির শেষ দশে শুরু চাইনিজ নিউ ইয়ার। কাজপাগল চায়নিজ জাতী পুরো বছরের মধ্যে এই সময়টাতেই সবচেয়ে উৎসব মুখর সময় পার করে। জানুয়ারীর ২য় সপ্তাহ থেকে ভাইরাসের ব্যাপারে কানাঘুষা শুনতে পাচ্ছি বেশ ভালো ভাবে। ৩য় সপ্তাহে চাইনিজ’রা চলে গেলো অফিস ছেড়ে। আমরা যারা বিদেশী কর্মী কেবল তারাই তখন অফিসে।

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ, ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে এক্সপোনেনশিয়ালি। অফিস থেকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরে আসার ঘোষনা দেয়া হলো। পরিস্থিতি তখনো এতটা ভয়ংকর পর্যায়ে যায়নি। সবকিছুই স্বাভাবিক যদিও সাংহাই শহরে মানুষের সংখ্যা অনেক কম তখন কেননা অনেকেই তাদের নিজের প্রভিন্সে চলে গেছে চাইনিজ চান্দ্রবর্ষ পালন করতে।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে একদিনে মৃত্যের সংখ্যা আড়াইশ ছাড়ালো। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার, ৭ হাজার করে বাড়ছে। দেখলাম, অফিস খালি হওয়া শুরু হলো। বাংলাদেশিসহ অনেক সহকর্মীরা উদ্ভিগ্ন হয়ে চায়না ছেড়ে নিজ দেশে চলে যাচ্ছে। আমরা অনেকেই এখানে থাকার চেষ্টা করলাম। মূলত যে ব্যাপারগুলো আমাদের এখানে থাকার ব্যাপারে সাহস দিয়েছে আজ সেগুলো নিয়ে কথা বলবো।

কেউ আক্রান্ত হলে পুলিশ ও চিকিৎসা কর্মীরা ব্যাপক নিরাপত্তা দিয়ে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ভাইরাস পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার সাথে সাথে পুরো পরিস্থিতি পালটে যেতে শুরু করলো। গণপরিবহনে লোকজনের চলাচল নেই। চাইনিজ নিউ ইয়ারের সকল আনন্দ অনুষ্ঠান বাতিল ঘোষনা করা হলো। জনসাধারণের চলাচলে নিয়ম বেধে দেয়া হলো। দৈনিক জীবনযাপনের চিত্রটা অনেকটা এইরকম ছিলো-

বাসে নেই কোন যাত্রী!

ডর্ম থেকে বের হয়ে অফিসে যাই, ডর্মের নিচেই বাস দাঁড়ানো থাকে। লিফটে করে ডর্ম থেকে নামতে হয়, লিফটের প্রেস বাটন সিলেক্ট করার জন্য লিফটের ভিতর একটা টিশ্যুবক্স রেখে দেয়া হয়েছে, যেন আক্রান্ত কেউ একই বাটনে হাত দিয়ে টাচ করে গেলেও পরের জনের হাত দিয়ে ধরতে না হয়। সবাই টিশ্যু দিয়ে লিফটের বাটন প্রেস করছে। লিফটের ভিতরের রাখা আছে একটা ডাস্টবিন। সবাই নিয়ম মেনে ডাস্টবিনে ব্যাবহৃত টিশ্যু ফেলছে। একটু পরপর পরিষ্কার কর্মীরা সেগুলো নিয়ে যাচ্ছে।

বাসে করে অফিসে পৌছে লাইন দিতে হয়। সবাইকে থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে তাপমাত্রা মেপে, সেই তাপমাত্রাসহ নিজের নাম ও মোবাইল নাম্বার একটা কাগজে লিখে ভিতরে ঢুকতে হয়। তাতে প্রতিদিনের একটা ডাটা পাওয়া যায় সহজেই। অফিসে আবার লাঞ্চের পর তাপমাত্রা মাপা হয়। সেটাও কাগজে লিপিবন্ধ করতে হয়। ভিড়ের আশংকা আছে এমন জায়গাগুলোতে জমায়েত বন্ধ করার জন্য অফিসের নিচের কফিশপ, স্মোকিং জোন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফিরতি বাসে অফিসে ফিরে আবার ডর্মের সামনে লাইন দিতে হয়। তাপমাত্রা পরীক্ষায় পাশ করেই তবে ঢুকতে হয় নিজের রুমে। ডর্ম থেকে একটা কার্ড দিয়ে দিয়েছে, তাতে আমার নাম ও আজকের তাপমাত্রা লেখা, সেটাও সাথে রাখতে হয় গণপরিবহনে চলার কার্ড হিসেবে।

 আমার বাইরে চলাচলের কার্ড, আজকে আমার শরীরের তাপমাত্রা ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রী।

এইতো গেলো ডর্ম থেকে অফিসের গল্প। এবার আসি দৈনন্দিন চলাচলের জন্য বাইরে যেতে হয় আমাদের, সেখানের চিত্রটা কিরকম?

আজকাল দৈনন্দিন জীবন যাপন, সাংহাই, চায়না।

বাজারসহ নৈমত্তিক সকল কেনাকাটার জন্য আমাদের প্রতিদিন বাইরে যেতেই হয়। এম্নিতেই শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ, তবুও সুপারশপগুলো খোলা রাখা হয়েছে। ধরেন কোথাও যাবেন বলে আপনি ট্যাক্সি ডাকলেন, ট্যাক্সি আসলো, এসে দেখলো আপনার মুখে মাস্ক নেই তাহলে সে আপনার ট্রিপ ক্যান্সেল করবেন। একদিন এক বাঙালি ভাই অনেক রাতে বাইরে থেকে ডর্মে ফেরার সময় এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে বলে আমার কাছে শেয়ার করেছে। সে ‘ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে’ বাইরে থেকে ডর্মে ফেরার সময় টেক্সি ডেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে মুখে মাস্ক নেই বলে। দু’একজনকে নাকি বেশি টাকা অফারও করেছিলো ডর্মে পৌছে দেয়ার জন্য! কিন্তু যেহেতু তারা আমাদের উবার ড্রাইভার নয়, তারা অস্বীকৃতি জানাইয়েছিলো, ফলে হেটে হেটে বিশাল দূরত্বের রাস্তা অতিক্রম করতে হয়েছিলো তাকে ভরা শীতের রাতে।

ছবিটা একটা সুপারশপের সামনে থেকে তোলা, যেভাবে ঢুকার সময় নিরাপত্তা বেষ্টনি পাশ করে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়!

শপিংমলগুলোও খোলা আছে। বাংলাদেশের বিমানবন্দরে যে থার্মাল স্ক্যানার মাত্র ৭টি’র কথা পত্রপত্রিকাতে আমরা জেনেছি যার মধ্যে ৬’টিই নষ্ট, সেগুলো এখানকার শপিং সেন্টারগুলোর সামনেই রাখা। আপনি নির্ধারিত স্থানে সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন, অপটিক্যাল স্ক্যানার আপনার শরীর স্ক্যান করে তাপমাত্রা বলে দিবে। আর শপিং সেন্টারে এ ঢুকতেই দেখবেন টেবিলের উপর রাখা আছে স্যানিটাইজার। হাতে মাখিয়ে নিতে পারেন নিজের জন্য, জ্বি পুরোটাই ফ্রি।

তারপর প্রতিদিনের আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যের সংখ্যা এমনকি যারা সুস্থ্য হয়েছেন তাদের সংখ্যাটাও দেখার জন্য একটা মোবাইল অ্যাপ্স তৈরী করা হয়েছে। গুগল ম্যাপের মতো, আপনি যেখানে যাবেন, তার আশেপাশের ৩৬০ ডিগ্রী জুরে একটা নেভিগেশন তৈরী করবে। সে অ্যাপ্স ব্যাবহার করে আপনি খুব সহজেই জানতে পারবেন আপনার আশেপাশের টেরিটরিতে কেউ আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে কিনা। সাংহাইতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কম হলেও, আমার নিকটবর্তী আক্রান্ত ব্যাক্তিটি আমার ডর্ম থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে ছিলো! ফলে সেই রাস্তা দিয়ে যেতামই না!

ডর্মে বসে অ্যাপ্সে লগইন করলাম, আমার আশেপাশে ৩৬০ ডিগ্রীতে আপাতত কেউ নতুন আক্রান্ত নেই।

এ স্ক্রিনশটটি আমার আশেপাশে নিকটস্ত আক্রান্ত ব্যাক্তির স্থান, লাল রঙের নেভিগেটরে চিহ্নিত।

সর্বশেষ আপডেট, https://www.worldometers.info/coronavirus/country/china/

প্রতিদনের লাইভ আপডেট। আমি সাংহাই এর মিনহাং শহরে থাকি, নতুন কেউ আক্রান্ত নাই। টোটাল ১৯ জন আক্রান্ত হয়েছিলো, সবাই রিকভার করেছে।

এভাবেই দারুন প্রস্তুতির ফলে চায়নাতে নতুন করে কেউ আক্রান্ত হচ্ছেনা। বলা যাচ্ছে প্রায় পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রনে চলে আসছে। গত তিনদিনে পুরো চায়নাতে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ২৪, ১৫ ও ২০। মোট আক্রান্ত প্রায় ৮১ হাজার যাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে সুস্থ্য হয়েছেন ৬৫ হাজার ৫৪৪ জন।

আমি জানি সম্প্রতি বাংলাদেশে ৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। যার ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাপকহারে আতংক ও ভিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আমি খুব অল্প কথাতে সচেতনার কথা বলবো।
১। প্রতিদিন পরিবারের সকলের শরীরের তাপমাত্রা মাপুন
২। মুখে মাস্ক ও হাতে মোজা ব্যাবহার করুন
৩। যেখানে সেখানে থুথু ফেলবেন না
৪। হ্যান্ডশ্যাক করার প্রয়োজন নাই আপাতত
৫। গণজমায়েত ও মামার দোকানে আড্ডা না দেয়াই ভালো
৬। যেকোন খাবার গ্রহনের আগে দুইহাত ও মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নিন, প্রতিবার।
৭। কারো জ্বর কাশি ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্ট একত্রে হলে আবেগ কন্ট্রোল করে তার সংস্পর্শ থেকে দূরে যেয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান।

এখন আক্রান্ত্রদের চিকিৎসা কিরকম করে করা যেতে পারে, আমার এ ব্যাপারে একটা ব্যাক্তিগত মতামত আছে।

আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখাটা ভীষণ জরুরি, ডাক্তার, নার্স কিংবা যেকোন ব্যাক্তিই আসলে নিরাপদ না এখানে। ফলে যদি বাংলাদেশে আক্রান্ত্রের সংখ্যা বাড়ে তাদেরকে জনমানবহীন জায়গায় রাখতে হবে, সরকার থেকে এ ব্যাবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে হাসপাতালের সকল সুযোগ থাকবে, চিকিতসার সকল সুযোগ থাকবে। ডাক্তার থাকবে, নার্স থাকবে, ওষুধ থাকবে, প্রয়োজনীয় সবকিছুই থাকবে। কিন্তু কেউ আক্রান্ত হলে সরকারের একটি বিশেষ টিম আক্রান্ত ব্যাক্তিকে সুস্থ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই আইসোলেশনে রাখবে। এবং সুস্থ্য হওয়ার পর তাকে বাসায় পৌছে দিয়ে যাবে। গরীব, ধনী, হিন্দু-মুসলমান, মন্ত্রী-এমপি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা যেকেউ! ভেদাভেদ না করে সবার জন্য একই ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে। চিকিতসা’র ব্যয় পুরোপুরি সরকার বহন করবে।

আমার মতে, নোয়াখালির ভাসানচর একটা ভালো জায়গা হতে পারে। কারণ এছাড়া বিশ্বের সবচে গণবসতিপূর্ণ দেশে এই ভাইরাস যদি মহামারী আকার ধারণ করে, তাহলে কি হবে সেটা আমরাই সহজেই অনুমান করতে পারি। বাকিটা আল্লাহ’র ইচ্ছা! কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে রাখাটাই সবচে শ্রেয়, আমরাই সবচেয়ে বেশী সময় পাচ্ছি প্রস্তুতি নেয়ার, ভুলে গেলে চলবেনা কথাটা!
সবাই সুস্থ্য থাকুক, ভালো থাকুক।

আহমেদ সাঈফ মুনতাসীর, চায়না সাংহাই