০২ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:২১

ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা: নোবেল পেলেন দুই গবেষক

জেমস পি অ্যালিসন ও তাসুকু হোনজো

২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হয়েছে। বছরের প্রথম নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে সোমবার, চিকিৎসা শাস্ত্রে। সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে ঘোষিতে এ পুরস্কারটি পেয়েছেন মাকির্ন গবেষক জেমস পি অ্যালিসন ও জাপানি গবেষক তাসুকু হোনজো। ক্যান্সার নিয়ে গবেষণায় দুই বিজ্ঞানী নোবেল পেয়েছেন বলে ইনস্টিটিউটের টুইটার অ্যাকাউন্টে জানানো হয়েছে। এই দুই গবেষক ক্যান্সারের চিকিৎসায় নেতিবাচক পাশ্বর্প্রতিক্রিয়াবিহীন থেরাপি আবিষ্কার করেছেন।

চিকিৎসার শাস্ত্রের পর পযার্য়ক্রমে পদার্থ, রসায়ন, শান্তি এবং অথর্নীতিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। যদিও এ বছর রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার স্থগিত করেছে।

বিজয়ীদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে কমিটির চেয়ারম্যান থমাস পার্লম্যান বলেন, ‘দেহের নেতিবাচক ইমিউন প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থাপনাকে বাধা প্রদানের মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য এই দুই প্রথিতযশা চিকিৎসাবিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো। ভিন্ন দুটি আবিষ্কারকে একীভূতকরণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে ক্যান্সার প্রতিরোধ ও নিরাময় এবং থেরাপি পদ্ধতির প্রভূত উন্নয়নসাধনের নতুন দ্বার উন্মুক্ত করেছেন তাঁরা।’ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই দুই বিজ্ঞানীর উদ্ভাবন চিকিৎসাবিজ্ঞান জগতে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে—যোগ করেন তিনি।

জেমস পি অ্যালিসনের উদ্ভাবন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য একাধিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার দ্বার উন্মোচন করেছে। অন্যদিকে তাসুকো হনজোর আবিষ্কার বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিকে বাস্তবিকভাবে কার্যকরকরণের দিকে ধাবিত করেছে। তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফলগুলোর মাধ্যমে যে পদ্ধতিগত উদ্ভাবনগুলো হয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে দেহের ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করার মাধ্যমে ক্যান্সারে আক্রান্ত টিউমার সেলের ওপর সহজে প্রভাব বিস্তার সম্ভব হয়েছে। অ্যালিসন একটি পরিচিত প্রোটিনের ওপর গবেষণা করেন, যেটি ইমিউন সিস্টেমের ‘গতিরোধক’ হিসেবে কাজ করে বা ক্রিয়াশীল হয়। তিনি উপলব্ধি করেন, এই প্রোটিনের ‘গতিরোধক শক্তিকে’ ক্রমান্বয়ে শিথিল করলে দেহের ইমিউন সেলগুলো টিউমার সেলগুলোকে আক্রমণ করতে অবমুক্ত হয়। তিনি ভাবনাটিকে একটি নতুন পদ্ধতি হিসেবে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে সফল হন।

জানা যায়, সদ্য নোবেলজয়ী জেমস পি অ্যালিসন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভাসিির্টর এমডি অ্যান্ডারসন ক্যান্সার সেন্টারের অধ্যাপক। অ্যালিসন ১৯৪৮ সালে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অ্যালিসে জন্মগ্রহণ করেন। অন্যদিকে তাসুকু জাপানের কিয়োটো ইউনিভাসিির্টর অধ্যাপক। তিনি ১৯৪২ সালে জাপানের কিয়োটোতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সাল থেকে কিয়োটো ইউনিভাসিির্টতে অধ্যাপনা করছেন।

আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে চিকিৎসাবিদ্যায় এই দুই নোবেল বিজয়ীকে একটি করে সোনার মেডেল, নোবেল ডিপ্লোমা ছাড়াও প্রায় ১০ কোটি টাকা সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে।

১৯০১ সাল থেকে শুরু হয়ে চলতি বছর পযর্ন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন ১১০ জন বিজ্ঞানী। এ পযর্ন্ত ১২ জন নারী চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন। বিজ্ঞানের এই শাখায় সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে নোবেল পুরস্কার জেতেন ফ্রেডারিক জি ব্যানটিং। ইনস্যুলিন আবিষ্কার করার স্বীকৃতি হিসেবে মাত্র ৩২ বছর বয়সে ১৯২৩ সালে তিনি এই গৌরব অজর্ন করেন। আর সবেচেয়ে বেশি বয়সে ১৯৬৬ সালে এই পুরস্কার জেতেন পিটন রোয়ুস। টিউমার সৃষ্টির জন্য দায়ী ভাইরাস শনাক্ত করে তিনি ৮৭ বছর বয়সে চিকিৎসায় নোবেল পান।

ডিনানামাইটের আবিষ্কারক ও ব্যবসায়ী স্যার আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এরপর প্রতিবছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কয়েক বছর করে বিরতির পরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবার পর্যন্ত মোট ১০৯ বার দেওয়া হয়েছে নোবেল পুরস্কার। সর্বশেষ ২০১৭ সালে চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন, জেফ্রি হল, মাইকেল রসবাশ ও মাইকেল ইয়ং। কোষ কীভাবে সময়ের হিসাব করে সেই পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য তাদের পুরস্কার দেওয়া হয়।

যেভাবে এলো নোবেল: ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হয়। ওই বছর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্য সাধারণ গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানব কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। মোট ছয়টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিষয়গুলো হল- পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য ও শান্তি। অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রদান শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালে। নোবেল পুরস্কারকে এসব ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের ইংরেজিতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, আলফ্রেড নোবেল ১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোমে একটি প্রকৌশল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও একজন উদ্ভাবক ছিলেন। ১৮৯৪ সালে তিনি একটি লোহা ও ইস্পাত কারখানা ক্রয় করেন, যা পরবর্তী সময়ে একটি অন্যতম অস্ত্র তৈরির কারখানায় পরিণত করেন। তিনি ব্যালিস্টিক উদ্ভাবন করেন, যা বিশ্বব্যাপী ধোঁয়াহীন সামরিক বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তার ৩৫৫টি উদ্ভাবনের মাধ্যমে জীবদ্দশায় তিনি প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হন যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ডিনামাইট।

১৮৮৮ সালে তিনি তার ভাইয়ের পরিবর্তে নিজের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিস্মত হন, যা একটি ফরাসি পত্রিকায় ‘এ মার্চেন্ট অব ডেথ হু ডেড’ নামে তা প্রকাশিত হয়। আসলে নোবেলের ভাই লুডভিগ মারা যান। নিবন্ধটি তাকে ভাবিয়ে তোলে এবং খুব সহজেই বুঝতে পারেন যে ইতিহাসে তিনি কীভাবে স্মরণীয় হতে চান, যা তাকে তার উইলটি পরিবর্তন করতে অনুপ্রাণিত করে। ১০ ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে নোবেল তার নিজ গ্রাম স্যান রিমোয় (ইতালি) মারা যান। সেই সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

নোবেল তার জীবদ্দশায় অনেকগুলো উইল লিখে গিয়েছিলেন। শেষটা লেখা হয়েছিল তার মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে ২৭ নভেম্বর ১৮৯৫ সালে প্যারিসে অবস্থিত সুইডিশ-নরওয়ে ক্লাবে। বিস্ময় ছড়িয়ে দিতে নোবেল তার সর্বশেষ উইলে উল্লেখ করেন, তার সব সম্পদ পুরস্কার আকারে দেয়া হবে যারা পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, শান্তি ও সাহিত্যে বৃহত্তর মানবতার স্বার্থে কাজ করবেন। নোবেল তার মোট সম্পদের (৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা) ৯৪ শতাংশ এ পাঁচটি পুরস্কারের জন্য উইল করেন। ১৮৯৭ সালে নোবেলের উইল অনুমোদন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নোবেল পুরস্কার প্রদানের জন্য নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি নামক একটি সংস্থা তৈরি করা হয়।