১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:০৮

শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার: শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী

শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী  © সংগৃহীত

শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা জানান। এ সময় তিনি বলেন, বাজেটের এনভেলপ বাড়াতে হবে এটা প্রধানমন্ত্রীর ভিশন।

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমরা সবাই জানি, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম শর্ত অর্থায়ন। গত বছরগুলোতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশের আশেপাশে থেকেছে এবং জিডিপির অনুপাতে তা দেড়-দুই শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেছে। এটি একটি কাঠামোগত সীমা। কিন্তু আমাদের সরকারের, বিশেষ করে  প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার।’

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বলে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে আমরা কী করব? অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাঝারি মেয়াদের বাজেট কাঠামো অনুযায়ী তিন বছরের ধাপে ধাপে ফিসক্যাল আপলিফট পরিকল্পনা দেব। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়লেও শুধু মোট টাকার পরিমাণ নয়, কোথায় টাকা যাবে সেটাও বদলাতে হবে। তাই বাজেটের সমতা ও শেখার ফলাফল দুটি প্রধান সূচক হবে। এখানে আবার বলি, প্রধানমন্ত্রীর মিশন হলো সামাজিক ন্যায় ও দক্ষতা দুটোই একসঙ্গে।’

শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, খরচের গুণগত মান বদলাতে হবে। আমরা স্বীকার করছি, উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ বছরের শেষে হঠাৎ খরচ হয়। এর ফলে বই, নির্মাণকাজ, প্রশিক্ষণ সবকিছুই স্কুল ক্যালেন্ডার মিস করে। একটি কঠিন সত্য আজ আমি পরিষ্কারভাবে বলছি গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি শিক্ষার্থীর সময় ও সুযোগের ক্ষতি। আমরা কী করব? প্রশাসনিক ভাষায় বলছি, যাতে আপনারা মাপতে পারেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনুমোদন ও প্রকল্প গেটকিপিং স্কুল বর্ষপঞ্জির সঙ্গে রি-অ্যালাইন করব। অর্থ বিভাগের ক্যাশ রিলিজ সমান কিস্তিতে না করে মাইলস্টোনভিত্তিক করব কোড, টেক্সটবুক, প্রশিক্ষণ, নির্মাণ সবগুলোর আলাদা মাইলস্টোন থাকবে। ই-জিপি (ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা) বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগে চালু করে প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানিং করব, যাতে জুনে এসে দরপত্রের ভিড় না হয়। কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টসের লেজার পর্যন্ত হিসাব থাকবে, কিন্তু সেই হিসাবের শেষ গন্তব্য হবে ক্লাসরুমের আওয়ার মানে পাঠদানের ঘণ্টা।’

তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন ব্যয়কে আবার অগ্রাধিকার দিতে হবে। চলতি ব্যয় স্কুলকে খোলা রাখে, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় স্কুলকে আধুনিক করে। আমাদের অগ্রাধিকার হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব তৈরি করা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও মূল্যায়ন সক্ষমতা তৈরি করা, স্কুলের অবকাঠামো বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক করা। এখানে আমরা নির্বাচনী অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন করব মিড-ডে মিল, পরিষ্কার টয়লেট এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, শিক্ষার মানে শুধু বই নয় শিক্ষার্থীর মর্যাদা।’

‘আমাদের ইশতেহারে আছে ফ্রি ওয়াইফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব। আমরা এটিকে গ্যাজেট প্রজেক্ট বানাব না, বরং শিক্ষণ-শেখার অপারেটিং সিস্টেম বানাব। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা ও সাইবার সেফটি—এই তিনটি বাধ্যতামূলক সক্ষমতা হিসেবে যুক্ত করা হবে। শিক্ষক ট্যাবের ভেতরে থাকবে পাঠ পরিকল্পনার টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক, উপস্থিতি ও শিখন প্রমাণ আপলোডের সুবিধা, যাতে শেখা ট্র্যাক করা যায়। প্রধানমন্ত্রীর ‘ডিজিটাল দক্ষ বাংলাদেশ’ মিশন বাস্তবায়নে ডিজিটাল দক্ষতা কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে শিক্ষা খাতকে যুক্ত করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে এটি আমাদের ইশতেহারে আছে। তবে বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে, কারণ শিক্ষক, কনটেন্ট ও মূল্যায়নের প্রস্তুতি প্রয়োজন। আমাদের নীতি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তৃতীয় ভাষা যেমন আরবি, চীনা, জাপানি, ফরাসি যেগুলোর শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষায় চাহিদা আছে। ভাষা শিক্ষা শুধু পড়া-লেখা নয়, শোনা ও বলাও যুক্ত করা হবে। মূল্যায়নে ধাপে ধাপে কমিউনিকেশন স্কিল অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কারণ পরীক্ষা যা মাপে, স্কুল সেটাই শেখায়। বিশ্ব প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বহুভাষিক শিক্ষা একটি বাস্তব হাতিয়ার।’

‘বিজ্ঞান, কোডিং ও রোবটিক্স। আমরা মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই বিজ্ঞান শিক্ষা, প্রযুক্তি সাক্ষরতা ও প্রজেক্টভিত্তিক কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেব। প্রতিটি উপজেলায় নির্বাচিত স্কুলে রোবটিক্স ও মেকার কর্নার তৈরি হবে। বিজ্ঞানকে বই থেকে বের করে টার্মভিত্তিক প্র্যাকটিক্যাল রুটিনে আনা হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিষয়জ্ঞান ও অ্যাসেসমেন্ট লিটারেসি বাধ্যতামূলক করা হবে। এই উদ্যোগগুলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে চালাবে।’

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাধ্যমিক থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক। আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী খেলাধুলায় জোর দিয়ে জাতীয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশ করা হবে। মাধ্যমিক স্তরে ক্রীড়া শুধু ইভেন্ট হিসেবে নয়, টাইমটেবিলভিত্তিক বাধ্যতামূলক হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ে স্কুল ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত স্পোর্টস পিরিয়ড থাকবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ট্যালেন্ট হান্ট এবং স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ বা লিগ চালু করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কারিকুলাম যদি দক্ষতার কথা বলে আর পরীক্ষা যদি মুখস্থ মাপে, তাহলে কোচিং বাড়বে। তাই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হবে প্রতিটি বিষয়ের লার্নিং ট্রাজেক্টরি ও গ্রেড-টু-গ্রেড কনসেপ্ট ম্যাপ প্রকাশ করতে। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে ওয়ার্কড এক্সাম্পল, প্র্যাকটিস সেট ও রিভিশন ক্যালেন্ডার যুক্ত করা হবে। বোর্ড পরীক্ষায় ধাপে ধাপে আইটেম ব্যাংক, ব্লুপ্রিন্ট, মডারেশন এবং স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন গাইডলাইন চালু করা হবে। লক্ষ্য একটাই শিখনফল; শুধু সনদ নয়, সক্ষমতা।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি শিক্ষা, কারিগরি সব ব্যবস্থা আছে। এই বৈচিত্র্যকে আমরা সম্মান করি। তবে বৈচিত্র্য মানে অসম মান নয়। একই সঙ্গে সব কারিকুলামে রোজার ছুটি সমন্বিত হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে ন্যূনতম শিক্ষণ মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরকারি বেতন-সুবিধা ও স্বীকৃতির সঙ্গে শিক্ষাদানের বাস্তব প্রমাণ যুক্ত হবে। কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং কারি ও আলেমদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আমাদের অঙ্গীকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ক্রেডিট ব্রিজ। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স তৈরি হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বাধ্যতামূলক করা হবে।’

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস নেবে না, গবেষণা ও উদ্ভাবন করবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট চালু করা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়ন করা হবে। এটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার রোডম্যাপের অংশ।’

জবাবদিহি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের টাকা খরচ হলো, কিন্তু ক্লাস হলো না এমন সংস্কৃতি ভাঙব। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক পাবলিক ড্যাশবোর্ড থাকবে প্রকল্প অগ্রগতি, প্রশিক্ষণ সংখ্যা, বই বিতরণ, ক্লাস ঘণ্টা সব তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ হবে। অভিযোগ ও সেবা মান পর্যবেক্ষণে ট্র্যাকিং নম্বরভিত্তিক ফিডব্যাক ব্যবস্থা থাকবে। রাষ্ট্র চলবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে।’

টাইমলাইনও তৈরি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথম ধাপ ডায়াগনস্টিক রিভিউ, উন্নয়ন বাজেট ফেরত যাওয়ার কারণভিত্তিক রুট-কজ অ্যানালাইসিস, শিক্ষক ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ও ভাষা শিক্ষা পাইলট ডিজাইন। দ্বিতীয় ধাপ প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ও পরিমাপযোগ্য সূচকসহ। তৃতীয় ধাপ পরীক্ষা ও মূল্যায়নে বড় টেকনিক্যাল রিফর্ম, সাধারণ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও ইনোভেশন ব্র্যান্ড স্কেল-আপ।’

এ সময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত রয়েছেন শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।