দ্বিগুণ বেতনের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে যত চ্যালেঞ্জ
পে স্কেলের সুপারিশ ঘোষিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন এখন বেশ চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর দীর্ঘ বিরতির পর নতুন পে-স্কেল ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— গত চার বছর ধরে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, সেই বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত অনেকটাই প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটি বাস্তবায়নের জন্য সাপ্লাই সাইড তথা সরকারের বিষয়টিও দেখতে হবে।
তিনি বলেন, ঋণ বাড়িয়ে মূলত পাবলিক সেক্টরে কর্মরত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা সাধারণত যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তার 'প্রজ অ্যান্ড কনস'— উভয় দিকই বিবেচনায় আনি। এই পটভূমিতে বর্তমান বাংলাদেশের পে-স্কেল ঘোষণাকে মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের দু’টি দিক দেখতে হবে—একদিকে যারা এই সুবিধার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে যারা এই অর্থের জোগান দেবে, অর্থাৎ সরকার।
ডিমান্ড সাইড থেকে দেখলে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ বিরতির পর নতুন পে-স্কেল ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গত চার বছর ধরে দেশে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, সেই বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত অনেকটাই প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু সাপ্লাই সাইড থেকে, অর্থাৎ সরকারের আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। সরকারের সেই সক্ষমতা কি আদৌ আছে? সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, সেটিকে কীভাবে সংকলন ও বাস্তবায়ন করবে; সেটাই এখন মূল আলোচনার বিষয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেমন এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে, ঠিক তেমনি আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে।
সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবসম্মত হলেও প্রশ্ন হচ্ছে—এই ব্যয় কীভাবে টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা হবে? অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণে ট্যাক্স রেভিনিউ বাড়াতে না পারে; এমনকি ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও যদি তা করতে ব্যর্থ হয়; তাহলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাবে কীভাবে? সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকে। এক, টাকা ছাপানো— যা কার্যত রাষ্ট্রীয় ঋণ বাড়ায়। দুই, দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা বা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া। যে পথেই যাক না কেন, বাস্তবে এটি রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপায়।
এই চ্যালেঞ্জের পেছনের কারণগুলো গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, তারা রাজস্ব আহরণে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি দেখাবে। কারণ বাস্তবে দেখা যায়—যেখানে দেশের প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষ কর নেটের আওতায় থাকার কথা, সেখানে নিয়মিত করদাতা মাত্র প্রায় ৩০ লাখ। এই জায়গায় সরকার যদি কর নেট সম্প্রসারণ করে তিন কোটিতে উন্নীত করতে পারত, তাহলে রাজস্ব আহরণে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসত।
একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, সেগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং ইনফরমাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফরমালাইজ করার ক্ষেত্রেও সরকারের কাছ থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই দুই প্রত্যাশার কোনোটিই পূরণ হয়নি। ফলে রাজস্ব আহরণে অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী নির্বাচিত সরকারের তুলনায় কোনো ব্যতিক্রমী বা যুগান্তকারী পরিবর্তন দেখাতে পারেনি।
অধ্যাপক শাহাদাত বলেন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবসম্মত হলেও প্রশ্ন হচ্ছে—এই ব্যয় কীভাবে টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা হবে? অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণে ট্যাক্স রেভিনিউ বাড়াতে না পারে; এমনকি ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও যদি তা করতে ব্যর্থ হয়; তাহলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাবে কীভাবে? সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকে। এক, টাকা ছাপানো— যা কার্যত রাষ্ট্রীয় ঋণ বাড়ায়। দুই, দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা বা বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া।
যে পথেই যাক না কেন, বাস্তবে এটি রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপায়। অর্থাৎ ঋণ বাড়িয়ে পাবলিক সেক্টরে কর্মরতদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সরকার যদি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে তা বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক নয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি। এই ধরনের ব্যয় চাহিদা-সৃষ্ট মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিতে পারে। কারণ যখন মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসে, তখন চাহিদা বাড়ে। কিন্তু যদি সেই অনুপাতে যোগান না বাড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দাম বাড়ে। পে-স্কেল ঘোষণার ফলে এই ঝুঁকিটিও বাস্তবভাবে সামনে চলে আসে, যা সরকারকেই ভবিষ্যতে সামাল দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।