১৪ বছর ধরে প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল

শিক্ষা দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস  © ফাইল ছবি

শিক্ষকতা পেশায় নিম্ন বেতন ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে দেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী এই পেশায় নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে রাজি নন। নিম্ন বেতন ও সামাজিক পদমর্যাদা কারণে শিক্ষকতায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। যার সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। শিক্ষকদের এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে সরকার পৃথক বেতন স্কেল চালুর প্রতিশ্রুতি  দিলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের ইশতেহারে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল প্রদান এবং স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তা এখনো আশার আলো দেখেনি। টানা ১৪ বছর ধরে তা শুধু প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।

এমন বাস্তবতার মাঝেই আজ ৫ অক্টোবর বুধবার দেশে পালিত হচ্ছে 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস।' ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ এ দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- 'শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষায় রূপান্তর শুরু।'

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতা ছাড়া প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়েও শিক্ষকতায় মেধাবীদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

সরকারি শিক্ষকরা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ পাচ্ছেন। বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষকরাও কেন্দ্রীয়ভাবে 'জাতীয় শিক্ষা নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ' (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পাচ্ছেন। একই সিলেবাস ও কারিকুলামে তাঁরা পাঠদান করলেও বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অথচ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংখ্যাতেও তাঁরা বেশি।

সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা পান তারা। স্কেলভিত্তিক পূর্ণ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা হিসেবে ১৫০০ টাকা, বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও পান। এর বাইরে উৎসব বোনাস স্কেলভিত্তিক দেওয়া হয়। পরবর্তী স্কেল নির্ধারণকৃত ও চলমান। ধারাবাহিক প্রমোশন ও বদলির ব্যবস্থা চালু আছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল ৩৫,৫০০ টাকা (৬ষ্ঠ গ্রেড)। অথচ বেসরকারি প্রধান শিক্ষকরা ২৯ হাজার স্কেলে (৭ম গ্রেড) বেতন পান। সরকারি শিক্ষকদের বিভাগীয় ভাতার ব্যবস্থা আছে। অবসরের পর পরিপূর্ণ অবসর ভাতাসহ মাসিক পেনশন আছে। সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য স্বল্প ও নির্ধারিত ব্যয় করতে হয়। তাদের সন্তানরা সরকার থেকে শিক্ষা ভাতা পায়।

সবচেয়ে বড় পার্থক্য পদমর্যাদায়। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তার পদমর্যাদা ভোগ করেন। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো পদমর্যাদাই নির্ধারণ করা নেই।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেলও সরকারিদের সমানই। তবে কেবল মূল বেতনটুকুই সমান, বাকি সব ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে আছেন। ৩০ হাজার বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী প্রতি মাসে সরকার থেকে মূল বেতন পান। এর সঙ্গে নামমাত্র বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়। তাদেরকে বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী মূল বেতনের শতভাগ বেতন প্রদান করা হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় মাত্র ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া। এটি নির্ধারিত। অর্থাৎ বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। চিকিৎসা ভাতা নির্ধারিত; মাত্র ৫০০ টাকা।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এ শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য ক্রমশ কমিয়ে আনার কথা বলা আছে। সমযোগ্যতায় চাকরি আর সমপরিমাণ শ্রম দিলেও বেতন-ভাতায় অধিক বৈষম্য কাম্য নয়। অপর এক শিক্ষক নেতা বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে পার্থক্য থাকবে- সেটিই স্বাভাবিক। তবে বৈষম্য থাকতে পারে না। এখন সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের যে পার্থক্য, তা রীতিমতো বৈষম্য।


সর্বশেষ সংবাদ