ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রাখবেন ম্যানচেস্টার সিটির কোচ গার্দিওলা
ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি নিজের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা। মঙ্গলবার টটেনহ্যাম হটস্পারের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলা চালিয়ে যাবেন।
এসময় তিনি বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের দুর্দশা এবং বিশেষ করে গাজার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তার লক্ষ্যেই তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন বলে জানান।
ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গার্দিওলা বলেন, ‘মানবজাতির ইতিহাসে এর আগে কখনোই আমাদের চোখের সামনে এখনকার চেয়ে এত স্পষ্টভাবে তথ্য আসার সুযোগ হয়নি।’ বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংঘাতের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিনে গণহত্যা, ইউক্রেনে যা ঘটছে, রাশিয়ায় যা ঘটছে এবং বিশ্বজুড়ে—সুদানসহ সব জায়গায় যা ঘটছে—সবই আমরা দেখছি। আমাদের সামনে কী ঘটছে? আপনারা কি তা দেখতে চান? এগুলো মানুষ হিসেবে আমাদের সমস্যা। এগুলো আমাদের সবার সমস্যা।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো থেকে আসা নির্মম ছবিগুলো দেখে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ৫৫ বছর বয়সী এই কোচ। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু তাকে দারুণভাবে ব্যথিত করে। গার্দিওলা বলেন, ‘যদি এটি বিরোধী পক্ষের সাথেও হতো, তবুও আমি কষ্ট পেতাম। অন্য কোনো দেশের ক্ষতি চাওয়া? এটি আমাকে কষ্ট দেয়। পুরোপুরি হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা—এটি আমাকে ব্যথিত করে। বিষয়টি এর চেয়ে জটিল আর কিছু নয়। যখন আপনার কাছে কোনো আদর্শ থাকে এবং সেটি রক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে, আর সেজন্য আপনাকে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করতে হয়? আমি দুঃখিত, আমি এর প্রতিবাদ করব। সবসময়, আমি সেখানে থাকব, সবসময়।’
আধুনিক সভ্যতার উৎকর্ষের মাঝেও এই হানাহানি তাকে হতাশ করে। তার মতে, ‘আমাদের কাছে এখন যে প্রযুক্তি এবং অগ্রগতি আছে, তাতে সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে মানবজাতি আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। আমরা চাঁদে পৌঁছাতে পারছি, আমরা সব করতে পারছি। কিন্তু তবুও, ঠিক এই মুহূর্তে, আমরা একে অপরকে হত্যা করছি। কেন? যখন আমি এই ছবিগুলো দেখি, আমি দুঃখিত, আমার খুব কষ্ট হয়। এই কারণেই যে কোনো অবস্থান থেকে যদি আমি কথা বলার মাধ্যমে একটি ভালো সমাজ গড়তে সাহায্য করতে পারি, আমি চেষ্টা করব এবং সেখানে থাকব। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, ন্যায়বিচারের জন্য আপনাকে কথা বলতেই হবে।’
উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৭১,৮০৩ জন নিহত এবং ১,৭১,৫৭৫ জন আহত হয়েছে। গত বুধবারও হামলায় প্রাণ হারিয়েছে এক শিশুসহ অন্তত ১০ জন। গত পাঁচ দিনের মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয়বার যখন গার্দিওলা গাজা পরিস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেন। গত ২৯ জানুয়ারি স্পেনে একটি চ্যারিটি অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি রুমাল ‘কেফিয়াহ’ পরে গাজার শিশুদের দুর্দশার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে নীরবতার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা তাদের একা ফেলে রেখেছি, পরিত্যক্ত করেছি।’ কেন ফিলিস্তিন নিয়ে বারবার কথা বলছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে গার্দিওলা বলেন যে শিশুদের মৃত্যুর দৃশ্য তাকে ‘গভীরভাবে বিচলিত’ করে। ক্রীড়া জগতের হাতেগোনা যে কজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বারবার ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কণ্ঠ তুলেছেন, তিনি তাদের অন্যতম।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে এই স্প্যানিশ ম্যানেজার আরও বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও কোনো নিখুঁত সমাজ নেই, কোথাও সব ঠিক নেই, এমনকি আমিও নিখুঁত নই, আমাদের আরও ভালো হওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। অনেক দেশে আমার অনেক বন্ধু আছে। যখন আপনার কোনো চিন্তা থাকে যা আপনি রক্ষা করতে চান এবং তার জন্য হাজার হাজার মানুষকে মারতে হয়, আমি দুঃখিত, আমি প্রতিবাদ করব। সবসময় আমি সেখানে থাকব।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল কর্মকর্তাদের গুলিতে রেনি গুড এবং অ্যালেক্স প্রেত্তি নামে দুই নাগরিকের নিহতের ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসী নীতি নিয়ে সমালোচনার রেশ ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন ঘটনা যদি যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বা এনএইচএস-এর কোনো নার্সের ক্ষেত্রে ঘটত তবে পরিস্থিতি কেমন হতো। গার্দিওলা প্রশ্ন করেন, ‘আমাকে বলুন, আপনি কীভাবে এটাকে সমর্থন করবেন?’