অক্সফোর্ড জয়ী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের গল্প

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা  © সংগৃহীত

বিশ্বসেরা বিদ্যাপীঠ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য যুক্তরাজ্যের এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সব সময় প্রথম সারিতে থাকে। এটার নাম শোনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। 

যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে পুরনো এই বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হয়েছিল ১০৯৬ সালে। এখনও পর্যন্ত ব্রিটেনের ২৮ জন প্রধানমন্ত্রী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের মধ্যে সবশেষ হলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। আর অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আর্ল অফ উইলমিংটন, ১৭৪২ সালে।

শুধু যুক্তরাজ্যের নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ হলেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতাবলে অর্জন করে নিচ্ছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সাম্প্রতিক সময়ে এমনই কয়েকজন শিক্ষার্থীর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের গল্পটা জেনে নেওয়া যাক—

তাসনিম জারা। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) এই চিকিৎসক বাংলাদেশে এমবিবিএস সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন।

করোনাকালে সম্মুখসারির যোদ্ধা তিনি। হাসপাতালে কাজের অভিজ্ঞতা আর স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা মেনে সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলায় করোনাবিষয়ক ভিডিও বার্তা প্রচার করেন তাসনিম, তাঁর ভিডিও দেখেছে লাখো মানুষ।

আরও পড়ুন: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন বাংলাদেশি তাসনিম জারা

মুনজেরিন শহীদ। যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইংরেজিতে কথা বলার সহজ উপায় বলে দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই মুনজেরিন এবার বিশ্বে ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে পুরোনো ও বিখ্যাত যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুয়েস্টিক অ্যান্ড সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ একুইজিশন নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। সম্প্রতি পেয়েছেন সনদও।

জানা যায়, চট্টগ্রামের মেয়ে মুনজেরিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। এরপর গত বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেন মুনজেরিন। পরে তিনি ডাকও পেয়ে যান।

আরও পড়ুন: এবার অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট হলেন মুনজেরিন

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসাইন অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে অক্সফোর্ড যাত্রাটা তার বেশ প্রতিকুল ছিল। প্রথম দুবছর টানা অক্সফোর্ডে পড়ার সুযোগ পেলেও ফান্ডিংয়ের অভাবে তিনি সেখানে যেতে পারেননি।

কিন্তু তাতে দমে যাননি উজ্জ্বল। তৃতীয় বছর আবার আবেদন করে সেবার ফুল ফান্ডিং এর সুযোগ পান। এরই মাধ্যমে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করেন তিনি।

আরও পড়ুন: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলেন মাভাবিপ্রবির শিক্ষার্থী

যেখানে অক্সফোর্ডে পড়ার সুযোগ পাওয়াটাই অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার, সেখানে নির্বাচিত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র ইউনিয়নের (অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন) সভাপতি হিসেবে। বলেছিলাম বাংলাদেশি আনিশা ফারুকের কথা। ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত; যিনি গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বে নির্বাচিত হলেন।

২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অক্সফোর্ডের ওয়েস্টন লাইব্রেরিতে আনিশা ফারুককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি লেবার ক্লাব তাকে এই পদে ভূষিত করে।

আনিশার বাড়ি বাংলাদেশের ভোলা জেলার চর ফ্যাশন উপজেলায়। তার বাবা ফারুক আহামেদ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। মেয়ের এই সাফল্যে বাবা বলেন, আনিশা শুধু পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেনি, সে বাংলাদেশের মুখও উজ্জ্বল করেছে।

আরও পড়ুন: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ছাত্র সংসদের সভাপতি হলেন বাংলাদেশি আনিশা

২০২০ সাল। এইচএসসি পরীক্ষায় বসা হয়নি তার। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাঠও চুকেনি। তার আগেই কলেজটির ছাত্র আহমেদ ইত্তিহাদ সুযোগ পেয়ে গেলেন অক্সফোর্ডে পড়ার।

মোটেই সহজ ছিল না তার অক্সফোর্ড যাত্রা। অক্সফোর্ডের আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) ও প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে হতাশ হননি। বিশ্বের নানা দেশে অধ্যয়নরতদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে পরিশ্রম করে গেছেন।

অক্সফোর্ডের টিউশন ফি বেশি হওয়ায় রিচ অক্সফোর্ড স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেন ইত্তিহাদ। বর্তমানে তিনি এই স্কলারশিপে সম্পূর্ণ বিনা খরচে অক্সফোর্ডের ম্যানসফিল্ড কলেজে গণিতে স্নাতক করছেন। হোস্টেলে থাকা ও খাওয়ার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ই বহন করছে।

আরও পড়ুন: এইচএসসি পেরোনোর আগেই অক্সফোর্ডে

সাতক্ষীরার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘উত্তরণ’ এর পরিচালক শহিদুল ইসলাম ও ঢাকা সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সৈয়দা কানিজ বিনতে সাবাহ্ দম্পতির সন্তান জাহিদ আমিন (শাশ্বত)। 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তরের সুযোগ পাওয়া বাংলাদেশী এই শিক্ষার্থী এর আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেছেন। অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য ‘অক্সফোর্ড ওয়েডেনফেল্ড অ্যান্ড হপম্যান’ বৃত্তির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন জাহিদ।

আরও পড়ুন: অক্সফোর্ডে চান্স পেলেন শাশ্বত, কম সিজিপিএ বাধা হয়নি

অক্সফোর্ড জয়ী আরেক শিক্ষার্থী আফরিন সুলতানা চৌধুরী। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার উইলিয়ামডন স্কুল অব প্যাথলজিতে স্নাতকোত্তরের সুযোগ পেয়েছেন। পেয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ।

তিনি এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগে অধ্যয়ন করেছেন। এছাড়া তিনি সুইডেনের কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউট থেকে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ লাভ করেছিলেন, যেখান থেকে প্রত্যেক বছর চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার কে পাবেন সেটি ঠিক করা হয়।

অক্সফোর্ডে পড়তে যাওয়াদের মধ্যে আরো একজন হলেন ডা. মো. সাজেদুর রহমান শাওন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক এ শিক্ষার্থী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পপুলেশন হেলথের উপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া তিনি সুইডেনের কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউট থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়াতে কর্মরত আছেন।


সর্বশেষ সংবাদ