০১ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:৪২

আন্দোলন, মামলায় বছরজুড়েই সরব ছিল হাবিপ্রবি

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়  © ফাইল ফটো

২০২০ সাল এমন একটি বছর, যা সারা বিশ্বের মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও ভুলে যেতে পারবে না। এই বছরটি মানুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী স্মরণ করিয়ে দিবে করোনা ভাইরাস, লকডাউন ও দীর্ঘ সময় ধরে বাসায় গৃহবন্দী সময়ের কথা। এ বছর যেমন আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে তেমনি অনেক কিছু আমাদের নতুন করে শিখিয়েছে। তেমনি দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি ছিল বছরজুড়ে।

স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম দিয়ে সূর্যোদয় হয় হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ২০২০ সাল। নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তির রেশ কাটতে না কাটতেই দিনাজপুরের স্থানীয় কৃষকদের কৃষি ভিত্তিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৯ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে কৃষক সেবা কেন্দ্র। কৃষক সেবা কেন্দ্রের উদ্বোধন হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বেশ সাড়া পরতে দেখা যায়।

১৭তম বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ১০ই জানুয়ারি আয়োজন করে হাবিপ্রবির বিজ্ঞান অনুষদ। দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। অন্যদিকে উক্ত দিনে কালের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা পুরষ্কার পান হাবিপ্রবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোঃ ফজলুল হক।

হাবিপ্রবি ডিবেটিং সোসাইটি ২৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১২ জানুয়ারি আয়োজন করা হয় রম্যবিতর্ক প্রতিযোগিতার। উক্ত দিনে হাবিপ্রবির সাবেক লাইব্রেরিয়ানের বিদায় উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ‘‘বিদায়ী সংবর্ধনা’’। এদিকে, ১৬ জানুয়ারি হাবিপ্রবিতে কৃষি, প্রাণীসম্পদ ও মৎস্যখামার কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন হাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মু. আবুল কাসেম। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে ( ৫ই ফেব্রুয়ারি ) হাবিপ্রবি উপাচার্য ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

প্রথম আবাসিক হল হিসাবে ফ্রি wi-fi সুবিধা পাওয়া শুরু করে ( ১১ ফেব্রুয়ারি ) হাবিপ্রবির কবি সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এর ঠিক একদিন পরেই প্রায় এক কোটি টাকা ব্যায়ে দেশের প্রথম ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি ক্লিনিকের যাত্রা শুরু হয় হাবিপ্রবি থেকে। যার সুফল ইতিমধ্যে পেতে শুরু করেছে দিনাজপুরের স্থানীয় মানুষেরা। ১৭ মার্চ দেশের প্রথম ক্যারিয়ার এডভাইজারি সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন হওয়ার পরপরেই করোনার সংক্রমণ রোধে বন্ধ হয়ে যায় হাবিপ্রবি।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ২৩ মার্চ হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে হাবিপ্রবির রসায়ন বিভাগ। এসময় অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় হাবিপ্রবির বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষক, কর্মকর্তা- কর্মচারী সহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে একদিনের বেতন দেয় হাবিপ্রবির সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। মেসভাড়া কমানোর জন্য আন্দোলন করে আসলেও অবশেষে ১০ মে অর্ধেক মেস ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় দিনাজপুর জেলার সকল মেস মালিক সমিতি।

করোনার মাঝে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। উক্ত দিনেই অনির্দিষ্টকালের জন্য হাবিপ্রবির একাডেমিক ও প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা হয়। পরিবহন সংকট মোকাবেলায় ২৮ জুন হাবিপ্রবির পরিবহন শাখায় যুক্ত হয় নতুন বাস। আবার স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্যহীন শিক্ষার্থীদের তালিকা চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ( ১৩ আগস্ট ) করে হাবিপ্রবি প্রশাসন।

কালো জাম থেকে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে জুস বানানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন হাবিপ্রবির ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের অধ্যাপক ড. মারুফ আহমেদ। তিনি প্রায় দুই বছর থেকে কালো জাম নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা যায়। মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস শুরুর দাবিতে গত ৭ সেপ্টেম্বর আন্দোলন শুরু করে। এরপর উক্ত আন্দোলনে কৃষি অনুষদসহ অন্যান্য অনুষদ যুক্ত হলে ৫৫ তম একাডেমিক কাউন্সিলে অনলাইন ক্লাস শুরু করার ব্যাপারে নির্দেশনা আসে।

কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ২১তম হাবিপ্রবি দিবস ১১ সেপ্টেম্বর দেখতে পায় হাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা। এদিকে প্রায় তিন বছর আগে চুরি হয়ে যাওয়া পরিসংখ্যান বিভাগের ল্যাবের যন্ত্রাংশ মেরামত কার্যক্রম শুরু হয় ১৬ সেপ্টেম্বর। নীরবে টিএসটিতে ব্যাংক স্থানান্তরের কাজ শিক্ষার্থীদের চোখে দৃশ্যমান হওয়ায় হাবিপ্রবির ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে ৩ অক্টোবর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বিকল্প প্রস্তাব দিলেও তা আলোর মুখ দেখে নি।

হঠাৎ ৬ অক্টোবর হাবিপ্রবির প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ১৭ জন শিক্ষক কর্মবিরতির ঘোষণা দিলে ৭ অক্টোবর হাবিপ্রবির রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেয়া হয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিব হাসানকে। ৯ অক্টোবর ১৬ জন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষক কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে পুনরায় কাজে যোগদান করেন এবং শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকায় অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিব হাসানের জায়গায় পুনরায় রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. মোঃ ফজলুল হককে।

এদিকে ১৮ অক্টোবর থেকে স্নাতকের ডিগ্রী চেয়ে উপাচার্যের বাসভবন, প্রশাসনিক ভবন সহ রংপুর- দিনাজপুর মহাসড়কে মানববন্ধন শুরু করে হাবিপ্রবির ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। পক্ষান্তরে ১৯ অক্টোবর প্রথমবার হাবিপ্রবি গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় যাবে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মু. আবুল কাসেম। করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের ক্রেডিট ফি কমানোসহ অকার্যকর ফি সমূহ মওকুফের জন্য হাবিপ্রবির সাংবাদিক সমিতি শিক্ষার্থীদের জনমত যাচাই করে প্রতিবেদন করে ২৯ আক্টোবর। যা ২২ ডিসেম্বর এসে আলোর মুখ দেখে। এদিকে ২ নভেম্বর শুরু হয় রংপুর বিভাগের অনলাইন পরিবেশ অলিম্পিয়াড ২০২০। আবার, হঠাৎই নিরাপত্তার দাবিতে ( ৯ -১০ নবেম্বর) কর্মবিরতি পালন শুরু করে হাবিপ্রবির প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর ও অবমাননার প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদ প্রতিবাদ ও মানববন্ধন ।

এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেসব বিষয় নিয়ে ক্যাম্পাস সব সময় সরব ছিল তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বহিস্কারাদেশ, দুই কর্মচারী-এক ছাত্র ও তিন শিক্ষকের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা, এক শিক্ষকের ২৮ দুর্নীতি ও হিসাব শাখার পরিচালক পদে পরিবর্তন, জন সংযোগ শাখার পরিচালক লাঞ্ছিত করণ ও মানববন্ধন, ১০ তলা ও ৬ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া, রুম বরাদ্দ নিয়ে দুই বিভাগের শিক্ষকের দ্বন্দ্ব, ক্লাস-পরীক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, মেস ভাড়া মওকুফ ও নিয়োগ পরীক্ষা, দাবি আদায়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি, নির্মাণাধীন ভবন থেকে শ্রমিক পড়ে আহত, ভবন নির্মাণে নিম্ন মানের ইট ব্যবহার, দুর্ঘটনায় তিন জন ছাত্রের মৃত্যু ও কর্মচারীর মৃত্যু, পদন্নোতির জন্য কর্মচারীদের আন্দোলন, অনলাইন ক্লাস বিড়ম্বনা, সিনিয়র শিক্ষিকাকে কর্মচারীর গালিগালাজ, একই বিভাগের দুই শিক্ষকের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও থানায় জিডি, অভিযুক্ত পদার্থ সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পক্ষে বিজ্ঞান ও বিএস অনুষদের শিক্ষার্থীদের অবস্থান, উপাচার্যের সাথে প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি, টানা ৯ মাস অফিসে না গিয়ে বাসায় থেকে উপাচার্যের দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা, ক্লাস-পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলন, অবরোধ এবং সর্বোপরি ভিসি পদে শিক্ষকদের দৌড়ঝাঁপ এবং পরস্পরের কাদা ছুড়াছুড়ি এর ঘটনা ছিল ক্যাম্পাস জুড়ে আলোচনার ইস্যু ।