১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩৯

মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগে সক্ষমতা ঘাটতিতে এনটিআরসিএ

লোগো  © ফাইল ছবি

দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ক্রমবর্ধমান দায়িত্বের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিতে ভুগছে। বিশেষায়িত জনবলের অভাব, নিয়োগ পরীক্ষার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না বলে মতামত দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কনসালটেশন কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে এ মতামত দেওয়া হয়েছে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য যোগ্য ও মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, নিবন্ধন, পরীক্ষা গ্রহণ, প্রত্যয়ন প্রদান এবং শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগ সুপারিশের মাধ্যমে দেশের শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।  তবে ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব ও কাজের পরিধির তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কাঠামোগত প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়।’ 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এনটিআরসিএ-এর কাজের পরিধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় বিশেষায়িত মানবসম্পদ বৃদ্ধি পায়নি। শিক্ষক চাহিদা নিরূপণ, পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ, নিবন্ধন ও নিয়োগ সুপারিশের এই বিস্তৃত ও জটিল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য বিদ্যমান জনবল অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটছে।’

এতে বলা হয়, ‘বর্তমানে এনটিআরসিএ কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর লিখিত পরিক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘসূত্রিতা বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এমসিকিইউ এবং মৌখিক পরীক্ষা ভিত্তিক নতুন প্রস্তাবিত নিয়োগ পদ্ধতিটিকে ঘিরেও প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নপত্র তৈরি ও ব্যবহারের জন্য যথার্থ ট্রায়াল ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান আংশিকভাবে যাচাই হলেও শিক্ষকের পেডাগজিক্যাল দক্ষতা, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা, শিক্ষাদানে আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি এবং নৈতিকতা ও  তাদের বাস্তব শিক্ষাদান দক্ষতা প্রদর্শনের কোনো কাঠামোগত মূল্যায়ন নেই। আসলে বর্তমানে শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ছাড়া শিক্ষকতার যোগ্যতা যাচাইয়ের কোন ব্যবস্থা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নাই। এর ফলে একজন প্রার্থী শিক্ষক হিসেবে বাস্তবে কতটা উপযোগী তা নিরূপণ করা কঠিন।’  

মন্ত্রণালয় বলছে, ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর দিক থেকেও এনটিআরসিএ উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। স্থায়ী অফিস অবকাঠামোর অভাব, অপর্যাপ্ত আইটি সুবিধা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কার্যকর ডেটা শেয়ারিং ফ্রেমওয়ার্ক না থাকায় শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ডিজিটাল ও সমন্বিত রূপ নিতে পারছে না। ফলে তথ্য যাচাই, শূন্যপদ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অদক্ষতা ও বিলম্ব সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫৫ ধরে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এবং এই অনুপাতও কার্যকরভাবে বিদ্যালয়ে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরও বলছে, ‘চার বছর মেয়াদি বি.এড. (সম্মান) ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত স্বীকৃতি ও প্রধান্য না পাওয়া দু:খজনক। দীর্ঘমেয়াদি পেশাভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চার বছর মেয়াদি বিএড সম্মান ডিগ্রিধারীরা  নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়িত না হওয়ায় শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকর্ষণ হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া, স্বল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর নিবন্ধন প্রক্রিয়ার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদনের চেষ্টা, রিট মামলা মোকাবেলাসহ নানা কারণে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা এনটিআরসিএ-এর একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে সুপারিশ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্যপদ দীর্ঘদিন পূরণ হয় না, যা সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এনটিআরসিএ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংস্থা হলেও বিশেষায়িত মানবসম্পদের অভাব, নিয়োগ পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দীর্ঘসূিত্রতাজনিত সমস্যার কারণে এটি বেসরকারি খাতে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।’