প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার্থীরা ৮০ শতাংশ নম্বর পাবে, বাস্তবে তিন বিষয়ের দুটিতেই ফেল
মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের দুর্বলতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ৮ম ও ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাইয়ে নেওয়া একটি পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীরা ৮০ শতাংশ নম্বর পাবে বলে প্রত্যাশা করা হলেও বাস্তবে তিন বিষয়ের মধ্যে ইংরেজি ও গণিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ফেল করেছেন। এমন তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক খসড়া প্রতিবেদনে।
মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কনসালটেশন কমিটি মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে এই খসড়া প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌলিক দক্ষতা বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের এবং তা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
পরামর্শক কমিটি দেশের ১১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করে। এসব বিদ্যালয় শহর ও গ্রামাঞ্চল ছাড়াও জলাবদ্ধ এলাকা, চর, হাওড়, উপকূলীয় অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, অতিদরিদ্র অঞ্চল, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত। পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ১০টি বিদ্যালয়ের ৮ম ও ৯ম শ্রেণির মোট ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর ওপর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ৫০ নম্বরের একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়।
পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজিতে ১৫ নম্বর এবং গণিতে ২০ নম্বরের প্রশ্ন ছিল। প্রশ্নগুলো কঠিন বা উচ্চতর দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য নয়; বরং পাঠ্যবইভিত্তিক সহজ ও মৌলিক বিষয় যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে প্রণীত। তবুও ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের গড় অর্জন তুলনামূলকভাবে কিছুটা গ্রহণযোগ্য হলেও ইংরেজি ও গণিতে গড় স্কোর মোট নম্বরের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইংরেজিতে ৫৫.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং গণিতে ৭১.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ৩৩ শতাংশের নিচে নম্বর পেয়েছে। গণিতে উচ্চ স্তরের শিক্ষার্থীর হার মাত্র ৫.৭ শতাংশ, যা গাণিতিক যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানমূলক দক্ষতার চরম দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তিনটি বিষয় মিলিয়ে সামগ্রিক শিখন অর্জনেও এই দুর্বলতা স্পষ্ট, যেখানে বাংলার তুলনামূলক ভালো ফল ইংরেজি ও গণিতের দুর্বলতায় ম্লান হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনটি ২০১৫ সালের এলএএসআই (LASI) প্রকল্পের ফলাফলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সে সময় ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা নিম্নস্তরে ছিল। এরপর মাধ্যমিক পর্যায়ে আর কোনো জাতীয় মূল্যায়ন উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওই বছর এসএসসিতে পাশের হার ছিল ৬৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বড় অংশই ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার কারণে ফেল করেছে।
কনসালটেশন কমিটির মতে, প্রাথমিক স্তরে শিখনের ভিত্তি দুর্বল হওয়াই মাধ্যমিক পর্যায়ের এই ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ। প্রাথমিক পর্যায়ের দুর্বলতা মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যবস্তুর জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে আরও তীব্র হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও দক্ষতার ঘাটতি বহন করে এবং তা ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে উচ্চশিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও শ্রমবাজারে, যেখানে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে এবং নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবের অভিযোগ করছেন।
প্রতিবেদনে শিখন ঘাটতির জন্য শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাকেও দায়ী করা হয়েছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার শ্রেণিকক্ষ, অনুসন্ধানভিত্তিক শিখনের অভাব, সহায়ক শিক্ষাসামগ্রীর সংকট এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য—এসব সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ গুণগত উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে শিখন ঘাটতি নিরসনকে নীতি ও পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, উপযুক্ত শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, সহায়ক ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সমতাভিত্তিক শিখন সুযোগ সৃষ্টি না করলে মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত রূপান্তর সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছে কনসালটেশন কমিটি।