শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও আবেদন শুরু, অধিকাংশই বাদ যাবে!
রবিবার থেকে শুরু হয়েছে দেশের নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন গ্রহণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট অথবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট অথবা ব্যানবেইসের ওয়েবসাইটে ‘Online M.P.O. Application’ শিরোনামে প্রদর্শিত লিংকের মাধ্যমে এ আবেদন করা যাবে। তবে হার্ডকপির মাধ্যমে এ সংক্রান্ত কোন আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বা তার অধীনস্থ দপ্তরে দাখিল করা যাবে না।চলবে ২০ আগস্ট পর্যন্ত।
এমপিওভুক্তির ব্যাপারে সরকার যে নীতিমালা জারি করেছে, তাতে নানা শর্তের কারণে অনেক অধিকাংশ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে যাবে। এ নীতিমালায় পাসের হার, শিক্ষার্থীর সংখ্যাসহ অনেক শর্তই উল্লেখ আছে, যা অনেক নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই।
বিষয়টি নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, নীতিমালার আলোকে যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্তি করা হবে।
জানা গেছে, সারাদেশে ৫ হাজার ২৪২টি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেতন পান না। অথচ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সরকার কর্তৃক সনদ দেওয়া হয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও নন-এমপিও শিক্ষক ও কর্মচারীরা শ্রমের মূল্য পাচ্ছেন না। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে অনেক দিন ধরে শিক্ষক-কর্মচারী আন্দোলন করে আসছেন।
সর্বশেষ, চলতি বছরের ১০ জুন থেকে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় এ কর্মসূচি করে তারা। এরপর ২৫ জুন থেকে আমরণ অনশনে যান। পরে ১৭ দিনের মাথায় জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের অনুরোধে আমরণ অনশন ভাঙ্গেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।
তাদের আন্দোলনের মধ্যে ১২ জুন সরকার ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮’ করে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ব্যাপারে যে নীতিমালা জারি করেছে, তাতে অনেক নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঞ্চিত থেকে যাবে। নীতিমালায় পাসের হার, শিক্ষার্থীর সংখ্যাসহ অনেক শর্তই উল্লেখ আছে, যা অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নেই।
এদিকে, ১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মোঃ কামরুল হাসানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে জানানো হয়, রবিবার (৫ আগস্ট) থেকে এমপিও-বিহীন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো (স্কুল ও কলেজ) এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন নেওয়া শুরু হবে। এ আবেদন গ্রহণ কার্যক্রম চলবে ২০ আগস্ট পর্যন্ত।
আদেশে বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইট অথবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট অথবা ব্যানবেইসের ওয়েবসাইটে Online M.P.O. Application শিরোনামে প্রদর্শিত লিংকের মাধ্যমে এ আবেদন করা যাবে। তবে হার্ডকপির মাধ্যমে এ সংক্রান্ত কোন আবেদন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বা তার অধীনস্থ দপ্তরে দাখিল করা যাবে না।
আদেশে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, এ কার্যক্রমে তদবির করার সুযোগ নাই। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণের সকল কার্যক্রম ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হবে এবং এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট নির্দেশকের ভিত্তিতে এমপিও প্রত্যাশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, নীতিমালার আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্তি করা হলে তাতে অধিকাংশই বাদ যাবে। শর্তের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ও এলাকার জনসংখ্য, পাশের হারের বিষয়, শিক্ষার্থীর সংখ্যা শিথিল করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, নীতিমালা করার পর আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছে আবেদন সবাই করতে পারবে। পরে আলোচনা সাপেক্ষে এমপিওভুক্তি করা হবে। আশা করি আগামীতে নীতিমালা সংশোধন করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তাদের গুনগত মান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রেও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। নিয়ম-নীতির আওতায় যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিও (মানথলি পে অর্ডার) ভুক্তির কাজ চলছে।
‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮’ শর্ত এর মধ্যে রয়েছে- শহরে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় যদি সহশিক্ষা বা শুধু বালক হয়, তবে ২০০ শিক্ষার্থী থাকতে হবে, আর বালিকা হলে ১৮০। গ্রামে হলে যথাক্রমে ১৫০ ও ১২০ জন হতে হবে, আর শহরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় যদি সহশিক্ষা বা শুধু বালক হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হতে হবে ৩০০। আর শুধু বালিকা হলে ২০০ জন। একই প্রতিষ্ঠান গ্রামে হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হতে হবে যথাক্রমে ২০০ ও ১০০ জন করে।
শহরে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যদি সহশিক্ষা বা শুধু বালক হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৪৫০ এবং বালিকা হলে হবে ২০০। আর একই প্রতিষ্ঠান গ্রামে হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে যথাক্রমে ৩২০ ও ১০০। শহরে উচ্চমাধ্যমিক কলেজ যদি সহশিক্ষা বা শুধু বালক হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ২০০। আর বালিকা হলে হবে ১৫০। একই প্রতিষ্ঠান গ্রামে হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে যথাক্রমে ১৫০ ও ১২০। শহরে স্নাতক পর্যায়ের কলেজ যদি সহশিক্ষা বা শুধু বালক হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ২৫০। আর বালিকা হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ২০০। গ্রামের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা হবে যথাক্রমে ২০০ ও ১৫০।
পরীক্ষার ফলবিষয়ক শর্তের মধ্যে রয়েছে-মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় শহরে হলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হতে হবে কমপক্ষে ৬০। পাসের হার হতে হবে ৭০ শতাংশ। আর গ্রামে এ হার যথাক্রমে ৪০ ও ৭০ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক কলেজের ক্ষেত্রে একই শর্ত রাখা হয়েছে এমপিও পাওয়ার যোগ্যতার ক্ষেত্রে। এছাড়া প্রতিটি ক্যাটাগরির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের যোগ্যতাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওকরণের ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীর বিষয়ে যেসব শর্ত রাখা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে-নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৮, মাধ্যমিকে ২২, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩০, উচ্চমাধ্যমিক কলেজে ১৭ এবং স্নাতক (পাস) পর্যায়ের কলেজে ২৮ শিক্ষক-কমর্চারী থাকতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওকরণ বিষয়ে ভৌগোলিক দূরত্ব ও এলাকার জনসংখ্যাবিষয়ক বেশকিছু শর্ত রাখা হয়েছে। নিম্নমাধ্যমিক স্কুলের ক্ষেত্রে শহরে ১ কিলোমিটার, গ্রামে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হতে হবে। মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে শহরে ১ কিলোমিটার ও গ্রামে ৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হতে হবে। উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে শহরে ২ কিলোমিটার ও গ্রামে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে হতে হবে। এছাড়া নিম্নমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতির ক্ষেত্রে স্কুল এলাকায় ১০ হাজার জনসংখ্যা থাকতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রে থাকতে হবে ৭৫ হাজার জনসংখ্যা।