১৯ জুলাই ২০১৮, ১৬:০৫

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঠিক খবরটি যায় না: অধ্যাপক আহমেদ কামাল

‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ সমাবেশ

কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে  ‘সঠিক খবর’ পৌঁছানো হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামাল।

কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের উপর নিপীড়নের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপারাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৭০ জন শিক্ষক যোগ দেন। কয়েকশ’ শিক্ষার্থীও ছিলেন এই কর্মসূচিতে।

প্রখর রোদের মধ্যে অসুস্থতা নিয়েও এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে অধ্যাপক কামাল বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে যারা থাকে, তারা তাকে প্রকৃত খবর পৌঁছে দেন না। খবর যদি রাষ্ট্রপ্রধান পেত, তাহলে বঙ্গবন্ধু কি সপরিবারে নিহত হত? খবর যদি রাষ্ট্রপ্রধানরা পেতই, তাহলে জিয়াউর রহমান কি নিহত হত?”

সরকারি চাকরিতে কোটা ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ ব্যানারে গত কয়েক মাস ধরে আন্দোলন করছে। আন্দোলনের নানা পর্যায়ে তাদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে। কারাগারে বন্দিও আছেন কয়েকজন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন শ্রেণীর নেতাদের দাবি, আন্দোলনকারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের ইন্ধনে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।

অধ্যাপক আহমেদ কামাল বলেন, “এই আন্দোলন নিয়ে একটাই সরকারি পদ্ধতি; আন্দোলনকে একটা ‘নাম দেওয়া’, যে নাম দিয়ে আন্দোলনকে দমন করা যায়। গত কয়েক বছরে এই কৌশলটা খুব পুরনো হয়ে গেছে। এই শব্দটা এখন আর খায় না লোকে।”

“একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলন, একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার পরও তাদের (সরকার) মনে হয়েছে, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এই দাবিটা আদায় করা হচ্ছে। সেই ক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী পুরোটাই দিয়ে দিলেন।

“আমি তো দেই নাই, আমার কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে- এই মনোভাব হচ্ছে জমিদারি মনোভাব। এই জমিদারি মনোভাব তখনই দেখা যায় যখন নাগরিকরা প্রজায় রূপান্তরিত হয়। আমরা আজকে প্রজা হয়ে গেছি, আমরা নাগরিক নাই। আমাদের সেই অধিকার নাই যে অধিকারের বলে আমি সরকারকে, প্রধানমন্ত্রীকে, সরকারের এমপিকে প্রশ্ন করতে পারি।”

“যখনি সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখনি তারা বিচ্ছিন্নতা ঠেকানোর জন্য পদ্ধতি গ্রহণ করে। সেই পদ্ধতির মধ্যেই যে তার মৃত্যুশেল, তা কোনো সরকার বুঝতে পারে না,” মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমার একটা অনুরোধ প্রক্টরের কাছে। আপনাকে ভুলে যেতে হবে যে আপনি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। একটু ভুলে যান। আপনি প্রশাসনের সাথে জড়িত, শিক্ষকতার সাথে জড়িত, কিন্তু আপনার ওই পরিচয়টা তো আপনি ভুলতে পারছেন না। শিক্ষকতা করতে গেলে এটা ভুলতে হবে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, চাকরি প্রার্থী শিক্ষার্থীদের ‘ধূমায়িত অসন্তোষের প্রকাশ’ হচ্ছে এই আন্দোলন।

“প্রধানমন্ত্রী বলছেন, শিক্ষকরা কেন এই আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে, সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারতেন খুব সহজেই। ছাত্র-ছাত্রী যারা আন্দোলন করছে তাদের সাথে যদি আপনি একটা ঘণ্টা সময় দিতেন, কিংবা আপনি যদি শিক্ষকদের সাথে কিছু সময় কথা বলতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন, এই দাবিগুলো কতটা ভেতর থেকে এসেছে, কত দিনের জমানো ক্ষোভ থেকে এসেছে।”

আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে  তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের দেখে আমরা সাহস পাই। কারণ বাংলাদেশ যে একটা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কিংবা ভয়ংকর যে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ পড়েছে, তা স্থায়ী হবে না, কারণ এই শিক্ষার্থীরাই সেই ভবিষ্যত আমাদের সামনে নিশ্চিত করে।”

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিনের সভাপতিত্বে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খানের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান।