১৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১৫:০৫

করোনাকালে ভিডিও গেমে আসক্তি বাড়ছে শিক্ষার্থীদের

  © টিডিসি ফটো

করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রাথমিক থেকে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, কবে খুলবে তারও নেই সঠিক নিশ্চয়তা। করোনার এই বন্ধে শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে আগ্রহ থাকলেও সময় গড়াতেই সেখানে ভাটা পড়েছে। শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে অবিভাবকদের অনেকেই তড়িঘড়ি করে কিনেছে স্মার্টফোন-ট্যাব, ইন্টারনেট সুবিধা পেতে নিয়েছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ।

কিন্তু তাতে সুফল কতটুকু? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ অন্যদিকে অনলাইন ক্লাসের নামে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সকলের হাতেই রয়েছে স্মার্টফোন-ল্যাপটপসহ পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা বুঁদ হয়ে আছে অনলাইন ভিডিও গেমিংয়ে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমবারের মত ভিডিও গেমে আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনলাইন গেম, মুঠোফোন, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমের ক্ষতিকর ব্যবহারকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত মানসিক রোগ নির্ণয়–বিষয়ক গাইডলাইনে (ডিএসএম-৫-) বিষয়টিকে ‘ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করে গবেষণার ভিত্তিতে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছিল।

জানা গেছে, করোনাকালে দিনের বেশিরভাগ সময়ই শিক্ষার্থীরা এই গেমিংয়ের পেছনে ব্যয় করছে, বেড়েছে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার। বর্তমানে জনপ্রিয় কিছু গেমের নাম পাবজি, কল অফ ডিউটি, ফ্রি ফায়ার, প্রো ইভুলেশন সকার (পেইস)।

বিকেল হলেই চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন মাঠে, ঝুপড়ি দোকানে বসে তরুণ সব শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধ হয়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় জনপ্রিয় এই গেম খেলতে দেখা যায়। গেম খেলার নেশায় এসব তরুণ শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই খেলাধুলা করতে চায় না। অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে মেশে না, রাত জেগে গেম খেলায় অনেকের সকালের খাবার খেতে হয় দুপুরে, অনলাইন গেম ছাড়া বাকি সব কিছুতেই অনীহা প্রকাশ করে এসব তরুণ শিক্ষার্থীরা। 

এ প্রসঙ্গে নগরীর চকবাজারের রফিক আহমদ নামে এক অভিভাবক বলেন, হঠাৎ করে করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাচ্চারা আগের মতো পড়ালেখায় ব্যস্ত নেই। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরে অবস্থান করছে তারা, এছাড়া হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন চলে আসায় দিন -রাত গেম খেলে তারা সময় কাটাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে আসক্তি।

তিনি আরও বলেন, অনলাইন ক্লাস এর কথা বলে তারা ক্লাস বাদ দিয়ে বন্ধুদের সাথে অনলাইনে চ্যাট ও গেমিংয়ে ঝুঁকছে। এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের দিন যদি আরো দীর্ঘ হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা মানসিকও শারিরীক দু’ভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং তাদের ভবিষ্যৎ বাধাগ্রস্ত হবে। এই মুহুর্তে তাদের শাসন করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে৷

জনপ্রিয় এসব গেম আবার আত্নহত্যারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত ৩ নভেম্বর দেশের কিশোরগঞ্জ জেলায় ফ্রী ফায়ার গেমের ডাইমন্ড কিনতে এক হাজার টাকা না দেওয়ায় রাফিন (১১) নামের এক শিশু ফাঁসিতে ঝুলে আত্নহত্যা করে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে পাবজির মতো সহিংসতামূলক এসব অনলাইন গেমিং দেখে অনেক শিক্ষার্থী নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায়।

বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ২০১৬ সালের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এরাই গেমিং আসক্তিতে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘ ৮ থেকে ৯ মাস যাবত দিনের অধিকাংশ সময় গেমিংয়ে সময় পার করা শিক্ষার্থীরা অনেকটাই আসক্ত হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মহামারি কাটিয়ে দেশে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে তখন শিক্ষার্থীদের গেমিংয়ের মাত্রাতিরিক্ত আসক্ত থেকে বের করে আনা অনেকটাই কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়বে। অতি মাত্রায় স্মার্টফোন ব্যবহার পড়ুয়াদের মধ্যে পড়াশোনার ইচ্ছা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলাফল হিসাবে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানও খুব খারাপ। এছাড়া তৈরি হচ্ছে ঝরে পড়ার আশঙ্কা অন্যদিকে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা, একাকীত্বের অনুভূতি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইনে ক্লাসের নাম করে অনেক শিক্ষার্থী বেশী সময় নেটে অবস্থান করলেও অভিভাবকরা শিক্ষাজীবনের কথা ভেবে কোন রকম আপত্তি করতে পারছে না।

এদিকে, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কোমলমতি অনেক শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় কৌতুহলবশত বিভিন্ন সাইটে প্রবেশ করছে বা করার চেষ্টা করছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গেমিং ডিজঅর্ডারের সঙ্গে অতি উদ্বিগ্নতা, বিষন্নতা এবং তীব্র মানসিক চাপের মতো মানসিক রোগ দেখা দিতে পারে। এসব গেম খেলোয়াড়েরাও মানছে এর খারাপ দিক তবে তারা বলছেন নিজ নিজ সচেতনতা দরকার।

এ প্রসঙ্গে ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ হেলাল দা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের মনের উপর একটা চাপ পড়েছে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা বিষন্নতায় ভুগছে। এই চাপ মোকাবেলায় অনেক শিক্ষার্থীরা বিনোদনের অংশ হিসেবে অনলাইনে গেম খেলে সময় পার করছে কিন্তু অপরিমিত গেম খেলায় তা পরবর্তীতে আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে যা অত্যন্ত ক্ষতিকর দিক।

তিনি আরও বলেন, আসলে করোনা যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা তাই এখন সরকার চাইলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারেনা। তবে শিক্ষার্থীরা যেন গেমিংয়ে আসক্ত হয়ে না পরে সেজন্য প্রত্যেক অভিভাবককে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে এবং গেম খেললেও তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল করতে হবে।