ইন্টারনেট শাসনকর্তার পা ২০-এ
‘গুগল, জ্ঞানের আরেক নাম।’ খুব একটা ভুল হলো? সম্ভবত না। আর হবেই বা কেন, সে যে ইন্টারনেট দুনিয়ার শাসনকর্তা। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সেই তো প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমাদের সামনে হাজির করে। না জানা আজব সব তথ্যও পাই ওর মাধ্যমে। আজ তার ২০তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন google
যেন টগবগে তথ্য সংগ্রাহক। প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ৪০ হাজার অনুসন্ধানের তথ্য দেয় গুগল। সে হিসেবে প্রতিদিন হয় তিন বিলিয়ন অনুসন্ধান! মূলত এ কারণেই গুগল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন। জন্মদিন উপলক্ষ্যে এ বছরের ডুডল অক্ষর আকৃতির বেলুন ও উপহারের বাক্সের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে গুগলের হোমপেইজ। যেখানে ক্লিক করলে একটি ইউটিউব ভিডিও চালু হচ্ছে; যাতে গুগলে সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চের বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে। গুগলের এবারের জন্মদিনের থিম হচ্ছে ‘ইতিহাসের জনপ্রিয় সব সার্চ’। এই থিমকে মাথায় রেখেই গত ২০ বছরে বিশ্বজুড়ে সার্চের ধরন ও প্রবণতায় পরিবর্তনের ধারাকে তুলে ধরতে 20years.withgoogle.com নামে একটি নতুন ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে গুগলের পক্ষ থেকে।
পেছনের গল্প: ১৯৯৬-এর জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু গুগলের। ল্যারি পেজ ও সারগে ব্রিনের হাত ধরে। এঁরা দু’জনেই ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাঁরা গুগ্লের ছদ্মনাম রেখেছিলেন ব্যাকরাব। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ‘google.com’ ডোমেইনটি রেজিস্টার্ড হয়। ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর দুই বন্ধু একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে গুগলের প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট এটি পাবলিক লিমিটেড হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সেই সময় ল্যারি পেজ, সের্গেই ব্রাইন ও এরিক স্কমিট গুগলে ২০ বছর একসাথে কাজ করতে একমত হন। সময়ের সাথে নিত্যনতুন পণ্য ও সেবা যোগ করে গুগলে প্রতিনিয়ত তাদের আকার ও উপযোগিতা বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে গুগল এক অবধারিত নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে নতুন নতুন কোম্পানি কিনে তার বহুমুখিতা সুদৃঢ় করেছে।
২০তম জন্মদিনে নতুন এই ডুডল প্রকাশ করেছে গুগল
গুগলের নামে পেছনে আরো যে গল্পটি রয়েছে তা হয়তো অনেকেরই অজনা। শব্দের বানান ভুল থেকে গুগল নামের উৎপত্তি। গাণিতিক হিসাবের গোগল (googol)-এর অর্থ- একটি সংখ্যার পেছনে একশ শূন্য। একজন প্রকৌশলী আসল নামের বদলে এই ভুল বানানটি লিখেছিলেন। সেই ভুল নামই গুগল!
আছে আরো অনেক কিছু: আজ বেশিরভাগ মানুষ গুগলের দরজা দিয়ে ইন্টারনেট দুনিয়া প্রবেশ করেন। জিমেইল, ইউটিওব, গুগল ড্রাইভ, গুগল ম্যাপ, জনপ্রিয়তম ইন্টারনেট ব্রাউজার ক্রমসহ বিনামূল্যের সব সফটওয়্যার তাদের। শুধু তাই নয়, সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। বলা হয়ে থাকে, ৮০ শতাংশ ইন্টারেন্ট ব্যবহারকারী গুগলকে হোমপেজ সেট করে রাখেন। গুগল শুধু সার্চের জন্যই নয়, বিশেষ দিনে অভিনব ভাবনায় উপহার দিয়ে থাকে আমাদের। কখনও মজার, কখনও বুদ্ধিদীপ্ত।
অস্বীকার করার উপায় নেই, অনলাইন জগতে অসংখ্য সার্চ ইঞ্জিন থাকলেও বর্তমানে গুগলের সমকক্ষ নেই কেউ। গুগলের ইমেইল সার্ভিস জিমেইল বলতে এক কথায় ‘একের ভেতর অনেক’। গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ছাড়া যেন একেবারেই অচল স্মার্টফোনের দুনিয়া। রয়েছে নিজস্ব স্মার্টফোন ও স্মার্ট ডিভাইস। এছাড়াও আরও অসংখ্য ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
গুগলের অপ্রাতিষ্ঠানিক মূলমন্ত্র হলো-‘Don’t be evil’
ইন্টারনেট দুনিয়ার শাসনকর্তা এই গুগল বাংলাদেশেও তার কার্যক্রম শুরু করেছে। ৯.৭৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (২০১১ পর্যন্ত) এই কোম্পানি প্রায় ৩২৪৬৭ (২০১১ পর্যন্ত) জন কর্মী নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইন্টারনেট দুনিয়া। আর প্রতিদিন নতুন চেহারা নিয়ে এই বিস্তৃত ভূগোলককে সংকুচিত থেকে আরো সংকুচিত করে এনে দিচ্ছে আমাদের হাতের মুঠোয়।
না জানলেই নয়
- গুগলের সব কিছুই ব্যবসা নয়। সেখানে অনেক মজার ব্যাপারসাপারও আছে। যেমন askew এই শব্দটি গুগলে লিখে দেখতে পারেন।
- গুগল সবসময় বলে, তারা সবুজ উদ্যোগ সমর্থন করে। এরই একটি হলো ছাগলের মাধ্যমে লনের ঘাসকাটা। ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগল সদর দফতেরর লনের ঘাসগুলো নিয়মিতভাবে কেটেছেটে ঠিকঠাক রাখতে হয়। সুতরাং আপনি যদি কখনও সেখানে যান, দেখতে পাবেন প্রায় ২০০ ছাগল সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ঘাস খেয়ে লনের ঘাস ঠিকঠাক রাখছে।
- জিমেইল, গুগল ম্যাপস, গুগল ড্রাইভ, গুগল ক্রোম-এসবের বাইরে ২০১০ সাল থেকে গুগল প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একটি করে কোম্পানির মালিক হচ্ছে। আপনি হয়তো টের পাবেন না, কিন্তু অ্যান্ড্রয়েড, ইউটিউব, ওয়ায, অ্যাডসেন্স-এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক গুগল। এরকম আরও ৭০টি কোম্পানি রয়েছে গুগলের।
- অফিসের বাইরে বার্তা যোগাযোগের মাধ্যমে প্রথম গুগল ডুডল চালু হয় ১৯৯৮ সালের ৩০ অাগস্ট। ল্যারি আর সের্গেই যখন একটি উৎসবে নেভাদা গিয়েছিলেন, তখনি প্রথম এই আইডিয়াটি মাথায় আসে। এরপর থেকেই ডুডল গুগলের একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়। বিশেষ বিশেষ দিন বা ব্যক্তিত্বের উপলক্ষে বিশেষভাবে করা শিল্প গুগলের চেহারায় ভেসে ওঠে।
- ১৯৯৯ সালে ল্যারি এবং সের্গেই গুগলকে ১ মিলিয়ন ডলারে বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তখন সেটা কেনার মতো কোনো গ্রাহক ছিল না। এমনকি দাম কমিয়ে দেয়ার পরেও কোনো গ্রাহক মেলেনি। এখন গুগলের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলার। হয়তো কেউ কেউ সেই সুযোগ হাতছাড়া করার জন্য এখন আফসোস করতে পারে।
- গুগলের মৌলিক আদর্শগুলোর একটি কখনও দুষ্টতে পরিণত হয়ো না। কিন্তু এই কোম্পানি এখনও সেই আদর্শে আছে কি না, সেই সিদ্ধান্ত আপনার।
- ফোবর্সের তথ্য অনুযায়ী, গুগলের জনক সের্গেই ব্রিন প্রথম দিকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, গুগলের অফিস কখনওই খাবার প্রাপ্তির স্থান থেকে ৬০ মিটারের বেশি দূরত্বে হবে না। গুজব আছে, তখন কোম্পানির সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার ছিল সুইডিশ ফিশ- একটি চিবানোর মতো মিষ্টি। কিন্তু এখন গুগলের লোকজনের জন্য নানা ধরনের মাংস আর ভালো মানের কফির ব্যবস্থা রয়েছে।
- গুগলে যারা কাজ করেন, এমনকি যারা নতুন কাজ করতে এসেছেন, তারা সবাই নিজের কুকুর সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারে। তবে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, তারা অফিসের ধরনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত, যেখানে সেখানে নোংরা করবে না।
সারা বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবহারীরা অনেকাংশেই এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছে তারা; এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি। এখন ভাবুন তো, হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে গেল জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগল। অনুমান করুন কী কী ঘটতে পারে!