২২ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:২২

‘সরকার ঋণ বাড়িয়ে শুধু পাবলিক সেক্টরের কর্মীদের সুবিধা দিচ্ছে’

প্রতীকী ছবি  © টিডিসি সম্পাদিত

নতুন বেতন স্কেলে সরকার ঋণ বাড়িয়ে শুধু পাবলিক সেক্টরের কর্মীদের সুবিধা দিচ্ছে। এই বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা আসন্ন নির্বাচিত সরকারের জন্য বাস্তবায়ন করা বেশ চ্যালেঞ্জের হবে। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য তার সাক্ষাৎকারটি চুম্বকাংশ হুবহু তুলে ধরা হল।

প্রত্যেকটা জিনিসেরই প্রজ অ্যান্ড কন্স (সুবিধা-অসুবিধা) যদি দেখি, তাহলে সুবিধা যেরকম রয়েছে অসুবিধাও তেমন রয়েছে। যদি বর্তমান কনটেক্সটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পে স্কেলের এই ঘোষণার কথা বলেন, তাহলে প্রথমত যারা ডিমান্ড করছে, চাহিদা করছে, তাদের দিক আর যারা সরকার অর্থাৎ এই ফান্ডটা যারা সাপ্লাই দেবে তাদের দিক— এই দুটো দিক যদি বিবেচনা করেন, প্রথমত এক দিক থেকে প্রাসঙ্গিক যে স্বাধীনতার পর এই প্রথম দীর্ঘ বিরতিতে পে স্কেল ঘোষণা হচ্ছে। তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতি চার বছর ধরে, আমরা বলি উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান, সেই প্রেক্ষাপটেও এটি প্রাসঙ্গিক এবং যৌক্তিক।

এখন সাপ্লাই সাইড থেকে যদি সরকারকে বিবেচনা করি, তাহলে আমরা বিষয়টাকে কিভাবে দেখি? সরকারের সেই আর্থিক সক্ষমতার জায়গাটুকু আছে কিনা? সরকার যে ভাবনাটা ভাবছে, সেটাকে কিভাবে সংকুলান করবে, সেই বিষয়গুলার দিক থেকে আমি মনে করি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেমন চ্যালেঞ্জ নিচ্ছে, ঠিক আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নির্বাচিত যে সরকার আসবে— তাদের উপরেও একটা চ্যালেঞ্জ দিয়ে যাচ্ছে।

এখন একটা প্রাসঙ্গিক যৌক্তিক বিবেচনায়, সরকারের কেন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারের চ্যালেঞ্জ হওয়ার কারণ হচ্ছে প্রথমত— এই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল যে তারা বিশাল রেভিনিউ বাড়াবে। কারণ তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষ আমাদের ট্যাক্স নেটের মধ্যে থাকা উচিত, তার মাত্র ৩০ লক্ষ মানুষ নিয়মিত কর দিচ্ছেন। অতএব সেই জায়গায় সরকার সম্প্রসারণ করে তিন কোটিতে উন্নীত করবে, বিশাল রেভিনিউ কালেকশন হবে, একই সাথে আরও প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হওয়া উচিত— সেটাও কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল। সেই দুটো প্রত্যাশার কোনটাই পূরণ না হওয়ায় সরকার রেভিনিউ কালেকশনে যুগান্তকারী কোন পরিবর্তন অথবা বিগত নির্বাচিত সরকারের চেয়ে ব্যতিক্রম কোন কিছু দেখাতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু খরচের দিক থেকে যে উদ্যোগটা এখন গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত উদ্যোগই, তা এখন সরকার কিভাবে বাস্তবায়ন করবে? সেটা আরেকটা অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ কিনা সেই বিষয়টা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে আলাপকালে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী

প্রথমত সরকার ট্যাক্স রেভিনিউ যদি যথেষ্ট পরিমাণ না বাড়াতে পারে, আগামী নির্বাচিত সরকারেও যদি না বাড়ায় তাহলে সরকার কিভাবে দিবে? সরকারের উপায় হচ্ছে দুটো। এক— সরকার প্রিন্ট করা, সেটাও রাষ্ট্রের ঋণ বাড়া। একই সাথে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ অথবা বহির্বিশ্ব থেকে ঋণ করতে পারে। অতএব যেভাবেই করুক না কেন প্রকৃতপক্ষে সেটা রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ ঋণ বাড়িয়ে পাবলিক সেক্টরে যারা কাজ করে তাদের সুবিধাটা দিচ্ছে।

এই সুবিধা দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ঋণের বোঝা চাপছে। সরকার যদি প্রিন্টে যায় অথবা ইনভেস্টমেন্ট ক্ষতি করে প্রাইভেট ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তাহলে সেটা রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক হবে না। উস্কানিমূলক মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে। কি জন্য? কারণ আমরা এটাকে বলে থাকি চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ আমাদের সবার পকেটে যখন ডাবল টাকা আসবে তখন প্রকৃতপক্ষে আমাদের চাহিদা বেড়ে যাবে। আর যদি যোগান না বাড়ে কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার যে শঙ্কা, সেই শঙ্কাটা কিন্তু সরকার এই পে স্কেলের মধ্যে তুলে ধরছে।

পে স্কেলের বেতন কাঠামো যেমন হওয়া উচিত ছিল
সংখ্যাকে দেখার বিষয়ে দুটো দিক রয়েছে। একটা হচ্ছে আপনি যখন বড় সংখ্যার ডাবল দেখেন, আবার ছোট সংখ্যার ডাবল দেখেন, দুটোর পার্থক্য কিন্তু অনেক মনে হবে। অর্থাৎ আপনি যদি সার্বিক বিবেচনায় গুণকটাকে কমান...। দেখেন, গত পে স্কেলে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন ব্যবধানে বিরতি ছিল ৯.২১। এখন সেটাকে কিন্তু ৮ করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্নের যে ব্যবধান, সেটা কমে আসছে। কিন্তু তারপরেও মানুষের কাছে মনে হচ্ছে যে ২০ হাজার বনাম ১ লাখ ৬০ হাজার, সেটা অনেক ব্যবধান।

অতএব যে কাজটুকু করার উচিত ছিল— সার্বিকভাবে কমলেও আমাদের গ্রেডের সংখ্যাটা যদি ছোট করে নিয়ে আসত, তাহলে প্রতি গ্রেডের যে ব্যবধানটা, মাঝখানে কয়েকটা গ্রেডে আপনার মনে হবে যে এদের পরিবর্তনটা কেন যেন অন্যদের তুলনায় কম। কিন্তু এই অসুবিধাগুলো সামনে বিবেচনা করবে কিনা এটা ফাইনাল না। এখন যারা উপরে চাকরি করে, তারা কিন্তু আনুষঙ্গিক যে সুযোগ-সুবিধা পায় সেটা অনেক বেশি। ধরেন, একজন সচিব, তার কিন্তু বেতন না, বর্তমান অবস্থায় বেতনের চেয়ে তিন গুণ ফ্যাসিলিটি বেশি পান। ট্রাভেল পান, আরও অনেক ধরনের কাজ করেন। অতএব তারা ব্রিলিয়ান্ট, তারা সবকিছু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আদারস বেনিফিটসগুলোর দিকে যদি নজর দেন, তাহলে কিন্তু উপরের শ্রেণিগুলো যেভাবে পায় নিচের শ্রেণিগুলো পায় না। অতএব সেই গুণকের সংখ্যাটা নিয়ে হয়তো সরকার বিবেচনা করতে পারে।

যেটা ভেবেছিলাম, হয়তোবা সর্বোচ্চ স্কেলটা ১ লাখ ২০ হাজার অথবা ২৫ হাজারের মধ্যে হবে। তখন সার্বিক ব্যবধান কমবে। একই সাথে মাঝখানে যে মনে হচ্ছে স্থিতি হয়ে যাচ্ছে, মানে এই দুই-তিনটা গ্রেড একই রকম মনে হচ্ছে, সেই জায়গাটা দূর করে মার্জ করে তাহলে তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রমোশন উপরের গ্রেডে যাওয়ার যে সুবিধাজনক ভাবনাটা ভাবত, তাদের মধ্যে এখন যেভাবে ভাবছে, তখন হয়তো আর ভাবত না।