২৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৬:৫৩

তারে কারেন্ট খায়, এক মিটারে বিল ১ লাখ ২০ হাজার

আশরাফুল আলম  © টিডিসি ফটো

ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের নামে বছরের পর বছর অন্যায় অনিয়মের শিকার সেখানকার সাধারণ মানুষ। এসব অনিয়ম সহ্য করে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন তারা। জমি-যায়গা বিক্রি করে পরিশোধ করছেন বিদ্যুৎ বিল। ওইসব এলাকায় এক মিটার ব্যবহার করে মাস শেষে বিল আসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, দূরবর্তী লাইন হওয়ায় তারে কারেন্ট খেয়ে ফেলে।

সম্প্রতি দেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সাপ্তাহিক অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান তালাশে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে এসব ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

স্থানীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অফিস এবং অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী মানুষের সব অভিযোগ। বিশেষ করে ফুলপুর পিডিবি অফিসের অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর আশরাফুল আলমের নাম সেখানকার স্থানীয় প্রত্যেকের মুখে মুখে। যত অনিয়ম আর দুর্নীতি হয় প্রত্যেকটি এ আশরাফুলের মাধ্যমেই হয়ে থাকে বলে জানান তারা।

ভুক্তভোগী আবুল কাশেম বলেন, বিল করার সময় মিটারে দেখিয়েছে ব্যবহার হইছে ১৮০০ ইউনিট। পরে তারা যখন বিলের কাগজ দিয়ে গেছে সেখানে দেখলাম লেখা ৩১৫০ ইউনিট, ১৩৫০ ইউনিট বেশি। গড়মিলের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে আপনাদের এটা অনেক দূরের লাইন তো, টানা লাইন। আপনারা বিদ্যুৎ না পুড়লেও তারে বিদ্যুৎ খেয়ে পেলে।

তারাকান্দা উপজেলার কাকনি ইউনিয়নের গোয়াতলা গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামান বলেন, আমার মিটারে এক লাখ বিশ হাজার টাকা বিল আসছে। আমি তাদেরকে বলছি যে আমার মিটারে এতো টাকা বিল কেন আসে? আমি তো শুধু একটা বাতি আর একটা ফ্যান চালাই। মিল-ফ্যাক্টরি চালালেও তো এতো টাকা বিল আসে না। বিল পরিশোধ করতে না পারায় তারা আমাদের নামে মামলা করে হয়রানিতে ফেলে দিয়েছে।

এছাড়া আসাদুজ্জামানের প্রতিবেশী চকিনা বেগমের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তার একটা একচালা ঘরে একটামাত্র বাতি জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ বিল এসেছে চল্লিশ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ওইযে ঘরে খালি একটা বাতি জ্বালাই। ফ্যান-ট্যান আমরা কিছুই চালাই না। চল্লিশ হাজার টাকা বিল আসছে আমাদের।

মাত্রাতিরিক্ত বিল আসার কারণে নয় মাস আগে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন উপজেলার পঙ্গুয়াই গ্রামের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম। কিন্তু মাস শেষে তার নামে ঠিকি বিল আসছে। তিনি অভিযোগ করেন, নয়মাস আগে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়ার পরেও মাসের পর মাস আমার নামে বিল আসা চলমান রয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ শুধু স্থানীয় দু’একজনের না। বিদ্যুৎ বিল কমানোর কথা বলে একই এলাকার রাশেদা বেগমের বৈদ্যুতিক মিটার খুলে নেয় স্থায়ীয় পিডিবি অফিসের লোকজন। মিটার না থাকা অবস্থায় তার বিচ্ছিন্ন সংযোগের বিল জমিজমা বিক্রি করেও পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। ঠিকমতো মাসের বিল পরিশোধ করতে না পারলে মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী সকলের।

আরও অভিযোগ রয়েছে, শুধু আবাসিক লাইনেই অনিয়ম বা দুর্নীতি নয়, বাণিজ্যিক গ্রাহকদের সঙ্গেও এমন আচরণ করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটারের বিল সংগ্রহ করে সরকারি খাতায় ইচ্ছে মতো জমা করা, খালি রাখা কিংবা কম বেশি করার কথাও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে।

অভিযুক্ত ফুলপুর পিডিবি অফিসের অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর আশরাফুল আলম বলেন, আমি যে টাকা নিছি, লেজারে বিল কমিয়েছি এগুলা সরকারি খাতায় জমা হয় নাই। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ায় নিয়ম আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে আশরাফুল বলেন, টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই। যেসব বিলের কাজ করি দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে আমি ৫ টাকা নিয়ে থাকি। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে আবার উপরের স্যারদের সাড়ে চার টাকাই দিয়ে দিছি। স্যারেরাও অন্যায় করেছে।

ফুলপুর উপজেলার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, হাতে যদি কেউ ক্যাশ টাকা দেয় সেটি লিগ্যাল না! অবশ্যই লিগ্যাল। টাকা পরিশোধ করছে কিন্তু সে টাকাটা কম্পিউটারে জমা হয় নাই। এটাতো অবশ্যই অনিয়ম হইছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ আলম শেখ বলেন, বিলের টাকা হাতে হাতে দেওয়ার কারণে এখানে অনেক গ্রাহক প্রতারিত হয়েছেন। এগুলো বিলে উঠানো হয়নি। আমি তো ফেরেশতাও না, এখানে ৮০ ভাগ সমস্যা হলো মিটার রিডারে। সেচের সময় অনেক ভুয়া বিল করা হয়েছে। সেচের সময় আমাদের এ অফিসটা ঈদের মৌসুম। অনেক অন্যায় আছে যেগুলো আমরা করতে চাইনা। অনেক সময় আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ে। আমরা বাধ্য এগুলা করতে। এগুলো তো এক বছরের না, বছরের পর বছর চলছে।

তবে এসব অনিয়ম আর অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান কোন কথা বলতে রাজি হননি।