০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:১১

সবার শঙ্কা সহিংসতা, নজরদারিতে যেসব আসন

নির্বাচনে সবার শঙ্কা সহিংসতা  © টিডিসি সম্পাদিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র দুই দিন। ভোটগ্রহণের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ততই বাড়ছে। এর সাথে বাড়ছে সহিংসতা, নাশকতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা। তবে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা রোধে চিহ্নিত আসনে নজরদারি বাড়াচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো আসনে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। পুলিশের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত দেশের অর্ধশতাধিক আসনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে- নির্বাচনের আগে ও পরে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। এমনকি গুপ্তহত্যা, টার্গেট কিলিংয়ের মত ঘটনাও ঘটতে পারে।

নির্বাচনে সংঘাতের শঙ্কা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ চরম পক্ষপাতিত্ব করছে। বাউফলের ওসি চূড়ান্তভাবে একপেশে আচরণ করছেন। তিনি বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জামায়াতের অফিস রেইড করছেন। এই ওসি বহাল থাকলে সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। জুবায়ের বলেন, ভোটে জামায়াত বিজয়ী হলে তারা কার্চুপির অভিযোগে বিশৃংখলা করতে পারে। তাই মারা নিরাপত্বাহিনতায় প্রশাসনের সহায়তা কামনা করছি।

আরও পড়ুন: নির্বাচনী এলাকায় চারদিন ‘বহিরাগত অবস্থানে’ নিষেধাজ্ঞা

জামায়াতের সেই দাবির প্রেক্ষিতে পটুয়াখালীর বাউফলে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াতের অভিযোগের পর বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।

এদিকে প্রার্থীতে প্রার্থীতে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। প্রার্থীর বক্তব্য নিয়ে ক্ষমা চাইতে বলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টাও চলছে প্রতিনিয়ত। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের মধ্যে শুরু থেকেই চলছে কথার লড়াই। এ নিয়ে উত্তাপের শঙ্কাও দেখছেন অনেকে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আইনশৃঙ্খলা আমরা আমাদের হাতে তুলে নেব না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হল ১২ তারিখে সব সন্ত্রাসীকে দূরে রাখা। যদি দূরে রাখতে না পারে এবং তারা কেন্দ্রে আসে, আমরা জনগণকে নিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলব। যারা ভোটকেন্দ্র দখল করতে আসবে, একজনও বাড়ি ফেরত যেতে পারবে না

বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস বলেন, সর্বোচ্চ গালিগালাজ সহ্য করে মাটি কামড়ে আমার কর্মীদের নিয়ে পড়ে আছি। কোনো শব্দ করছি না। খেয়াল করেছেন না আপনারা? সেই মেডিকেল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে আছি।

ইসি সচিবালয়সহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে ভোটের মাঠে সংঘর্ষ, হামলা, উত্তেজনা, বিরোধসহ দেড় শতাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪২ হাজার ৭৬১ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ চরম পক্ষপাতিত্ব করছে। বাউফলের ওসি চূড়ান্তভাবে একপেশে আচরণ করছেন। তিনি বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জামায়াতের অফিস রেইড করছেন। এই ওসি বহাল থাকলে সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়— অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ইতোমধ্যে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ আসন শনাক্ত করেছে, যেসব আসনে সংঘাত-সহিংসতার বেশি শঙ্কা রয়েছে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আগামীতে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ সব এলাকার ছোট-বড় সন্ত্রাসী, কিলার, শুটারসহ বিভিন্ন অপরাধীর তালিকা করে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা কোনো প্রার্থীর হয়ে কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের পাঁয়তারা করছে কি না সেদিকে নজর দিচ্ছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

ইতোমধ্যে এ সব তথ্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশের কাছে এই সতর্ক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দারাও এ সব আসনে বেশি নজর দিচ্ছেন। ফের যাতে এ সব আসনে কোনো ঘটনা না ঘটে- সেদিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে পুলিশ। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। 

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র। সব কেন্দ্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। ২৫ হাজার ৭০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা ইতোমধ্যে সেট করা হয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্রভিত্তিক থাকবে সিসিটিভি ক্যামেরা।

সর্বোচ্চ গালিগালাজ সহ্য করে মাটি কামড়ে আমার কর্মীদের নিয়ে পড়ে আছি। কোনো শব্দ করছি না। খেয়াল করেছেন না আপনারা? সেই মেডিকেল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে আছি— মির্জা আব্বাস, ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ও বিএনপি নেতা

সংঘাত সহিংসতা ঠেকাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঝুঁকিপূর্ণ আসনের পাশাপাশি অন্যান্য আসনগুলোতে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। ইতোমধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী) ১ লাখ ৮ হাজার ৮২৫ জন মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও ১ হাজার ২১০টি প্লাটুনে বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন মোতায়েন থাকবে। উপকূলীয় ১০টি জেলার ১৭টি আসনের ২০টি উপজেলায় ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড সদস্য মোতায়েন করা হবে। এবার পুলিশ মোতায়েন করা হবে ১ লাখ ৫৭ হাজার।

এদিকে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে এ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন: লড়াইটা জুলাইয়ের প্রধান মুখ বনাম ২২ বছরের ওয়ার্ড কমিশনার

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ৩৬ দিনের মধ্যে ১৫ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতা, ১০২ নিহত, ১ হাজার ৩৩৩ অস্ত্র নিখোঁজ, ডিপফেক ও ভুল তথ্যের বাড়তি হুমকি, সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০-এর বেশি হামলার ফলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

অতি ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঢাকা-৮, ঢাকা-৭, ঢাকা-১৫, পাবনা-১ ও ৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। এই ১৩টি আসনের বাইরে আর ৪৫টি আসনকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো- ঢাকা-১০, নারায়ণগঞ্জ-৩, ময়মনসিংহ-১০, ময়মনসিংহ-১১, নেত্রকোণা-৩, কিশোরগঞ্জ-৫, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ফরিদপুর-৪, সুনামগঞ্জ-২, মৌলভীবাজার-৩, কুমিল্লা-১১, চাঁদপুর-৪, নোয়াখালী-২, চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৬, পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-৩, লালমনিরহাট-১, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-২, ভোলা-১, বরিশাল-৩, পিরোজপুর-২, টাঙ্গাইল-৮, রংপুর-৩, রংপুর-৪, গাইবান্ধা-৫, বগুড়া-২, বগুড়া-৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, রাজশাহী-১, রাজশাহী-২, নাটোর-১, সিরাজগঞ্জ-৪, কুষ্টিয়া-১, কুষ্টিয়া-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, ঝিনাইদহ-৩।

আইনশৃঙ্খলা আমরা আমাদের হাতে তুলে নেব না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হল ১২ তারিখে সব সন্ত্রাসীকে দূরে রাখা। যদি দূরে রাখতে না পারে এবং তারা কেন্দ্রে আসে, আমরা জনগণকে নিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলব। যারা ভোটকেন্দ্র দখল করতে আসবে, একজনও বাড়ি ফেরত যেতে পারবে না— নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী ও এনসিপি নেতা

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষ হয়েছে। এ সব আসন হলো- ঢাকা-১৫, কুমিল্লা-১১, যশোর-৫, কুমিল্লা-৯, বাগেরহাট-১, খুলনা-৩, শরীয়তপুর-১, সিরাজগঞ্জ-১, ঢাকা-১২, ভোলা-৩, চট্টগ্রাম-২, ফেনী-৩, ফেনী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, ময়মনসিংহ-১, বগুড়া-৫, কিশোরগঞ্জ-৪, চট্টগ্রাম-১১, বরিশাল-১, মাদারীপুর-৩, ভোলা-২, ময়মনসিংহ-৯, লক্ষ্মীপুর-২, টাঙ্গাইল-১, খুলনা-২, সিরাজগঞ্জ-২, জামালপুর-৪, শরীয়তপুর-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঢাকা-৩, ঝালকাঠি-১, চট্টগ্রাম-১, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-২, ঢাকা-৪ ও ভোলা-৪।  পঞ্চগড়-১, লালমনিরহাট-১, চুয়াডাঙ্গা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-৩, ভোলা-১, বরিশাল-৩, টাঙ্গাইল-৮, শেরপুর-৩, নেত্রকোণা-৩, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৮।

নিজেদের পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলছে, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, অর্ন্তকোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগের মতোন রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশিশক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহত রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে।