মাস্টারমাইন্ড জাবেদ পাটোয়ারি, বাস্তবায়নকারী টি এম জুবায়ের
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে বিরোধী দলগুলো। সেই নির্বাচনকে রাতের ভোট হিসেবে আখ্যা দেন তারা। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় দিনের আলো ফোটার আগেই সারা দেশে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখে ক্ষমতাচ্যূত দল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। রাত ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত চলে ব্যালটে সিল মারা। ভোট চুরির এই মহাযজ্ঞের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন পুলিশের তৎকালীন মহামহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী। আর যাবতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক (এনএসআই) টি এম জুবায়ের।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এসব কথা উঠে এসেছে। গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেন কমিশনের সদস্যরা। গতকাল বুধবার (১৪ জানুয়ারি) কমিশনের ৩২৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে নজরদারি, হস্তক্ষেপ এবং সর্বোপরি একটি নির্বাচনের যাবতীয় কার্যক্রমে ড্রাইভিং সিটে (চালকের ভূমিকা) থাকতে একটি ‘স্পেশাল সেল’ স্থাপন করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তাদের ভেটিং (যাচাই) ও বদলি, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভেটিং ও পুনর্বিন্যাস, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি এবং নির্বাচনের আগের রাতে ভোটের পরিকল্পনায় এই বিশেষ সেল বিশেষ ভূমিকায় ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তারাই কমিশনের কাছে রাতে সিল মেরে রাখার কথা স্বীকার করেছেন। ৩০ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার মধ্যে ২৭ জনই স্বীকার করেছেন যে তাদের কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা হয়েছিল। ভোটের দিনের আগের রাতেই অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও পুলিশ কর্তৃক নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তির খবর পাওয়া যায়।
নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। ৯৯ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পড়েছে ১২২টি কেন্দ্রে। ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে ৭ হাজার ৬৮৯টি কেন্দ্রে। ভোটের দিন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে ব্যাপকভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রের শতভাগ বৈধ ভোট শুধু একজন করে প্রার্থী পেয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী ১ ভোটও পাননি।