১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪১

শিক্ষক সংকটে ধুঁকছে আনোয়ারার প্রাথমিক শিক্ষা

আনোয়ারা উপকূলের দক্ষিণ গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ইনসেটে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস)  © টিডিসি

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় গভীর সংকট দেখায় দিয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে উপজেলার বহু বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান কার্যত ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, উপজেলার ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০টিতেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি ২৭টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য।

প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমে মারাত্মক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত তদারকি, একাডেমিক পরিকল্পনা, শিক্ষকদের সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন, সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক সংকটের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় শিক্ষার মান যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি অভিভাবকদের আস্থাও হারিয়ে ফেলছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুসারে, আনোয়ারায় বর্তমানে ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ২১ হাজার ৯৮০ জন। অথচ এই বিপুল শিক্ষার্থী সংখ্যার বিপরীতে অর্ধেকের কাছাকাছি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। 

প্রধান শিক্ষকহীন বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব গহিরা, দক্ষিণ গহিরা, মালঘর, উত্তর ইছাখালী, দক্ষিণ ইছাখালীসহ মোট ৫০টি বিদ্যালয়। অন্যদিকে দক্ষিণ গহিরা, পূর্ব গহিরা, খিলপাড়া, হাইলধর, গুজরা, পরৈকোড়া ও চারুশীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ২৭টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

বিশেষ করে উপকূলীয় বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি আরও করুণ। দক্ষিণ গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নথিপত্র অনুযায়ী দুজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও তারা প্রায় এক বছর আগে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। ফলে বাস্তবে বিদ্যালয়টি এখন শিক্ষকশূন্য অবস্থায় রয়েছে।

একইভাবে পূর্ব গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক থাকলেও একজন প্রশিক্ষণে রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক না থাকায় আরেকজন শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাকে সপ্তাহে দু-তিন দিন অফিসিয়াল কাজে উপজেলা পর্যায়ে যেতে হয়। এতে করে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান কার্যত একজন শিক্ষক দিয়েই চালানো হচ্ছে।

খোর্দ্দগহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই ধরনের সংকট বিরাজ করছে। একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদান করাতে গিয়ে শিক্ষকরা হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে পাঠদানের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, তাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২২০ জন, অথচ শিক্ষক মাত্র তিনজন। এই তিনজন শিক্ষককে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ছয়টি শ্রেণির কার্যক্রম চালাতে হয়। একসঙ্গে এতগুলো শ্রেণি সামলাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

পূর্ব গহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইদ্রিছ আলম বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে দুই শিফটে ছয়টি শ্রেণির কার্যক্রম চলে। শিক্ষক রয়েছি তিনজন, তার মধ্যে একজন প্রশিক্ষণে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক কাজের চাপও আমার ওপর পড়েছে। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন অফিসিয়াল কাজে উপজেলা পর্যায়ে যেতে হয়, এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।’

এ অবস্থায় হতাশ অভিভাবকরাও। স্থানীয় অভিভাবক সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা হচ্ছে না। বিশেষ করে উপকূলের বিদ্যালয়গুলোতে নামমাত্র শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে কিন্ডারগার্টেন বা অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে।

জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হিন্দোল বারী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘদিন নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকা, অবসরজনিত শূন্যতা এবং বদলির কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় শিক্ষক বদলি হলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করা যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান হবে।’

তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আনোয়ারার উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।