নাভারন-ভোমরা রেলপথে পূরণ হতে যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দেড় শতাব্দীর স্বপ্ন
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে সাতক্ষীরাবাসীর। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শেষ জেলা হিসেবে এত দিন রেল যোগাযোগের বাইরে থাকা সাতক্ষীরা এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কে। যশোরের নাভারন থেকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগে জেলাজুড়ে বইছে আনন্দের জোয়ার।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নাভারন-ভোমরা রেলপথ নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে ঋণ সহায়তা হিসেবে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সয়েল টেস্ট, জমি চিহ্নিতকরণ এবং ছয়টি স্টেশন নির্ধারণসহ প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
এই রেলপথে নাভারন, কলারোয়া, মাধবকাঠি, সাতক্ষীরা সদর এবং ভোমরা স্থলবন্দরসহ মোট ছয়টি আধুনিক স্টেশন নির্মাণ করা হবে। রেললাইন চালু হলে যাতায়াত ব্যবস্থা যেমন সহজ হবে, তেমনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি পাবে নতুন গতি।
হিমসাগর আম, রপ্তানিযোগ্য হিমায়িত চিংড়ি, সুন্দরবনের মধু, ভোমরা স্থলবন্দর ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জন্য পরিচিত সাতক্ষীরা জেলা। নতুন রেল যোগাযোগ এই জেলার কৃষি, শিল্প, পর্যটন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাগআঁচড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম বলেন, নাভারন-সাতক্ষীরা-ভোমরা রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটানোর ঐতিহাসিক উদ্যোগ। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে জেলা রেল যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, সেই সাতক্ষীরাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।
কলারোয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আফিয়া বলেন, ‘আমি প্রতিদিন বাগআঁচড়া থেকে কলারোয়া সরকারি কলেজে যাতায়াত করি। বর্তমানে বাস বা অন্যান্য যানবাহনে যাতায়াত করতে অনেক সময় লাগে, ভোগান্তিও পোহাতে হয়। রাস্তায় জ্যাম, অতিরিক্ত ভাড়া ও অনিরাপদ যাত্রা আমাদের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সমস্যায় ফেলছে। নাভারন-সাতক্ষীরা-ভোমরা রেলপথ চালু হলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য যাতায়াত অনেক সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে। অল্প খরচে কম সময়ে কলেজে পৌঁছানো যাবে, এতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া আরও সহজ হবে।’
ভোমরা স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা বলছেন, রেল যোগাযোগ চালু হলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমান বলেন, রেললাইন হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
বেনাপোল রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানান, একাধিক ধাপে রেলের জমি নির্ধারণ, সয়েল টেস্ট এবং স্টেশন পরিকল্পনার কাজ শেষ হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের সঙ্গে রেলের সম্পর্ক নতুন নয়। ১৮৬২ সালে দর্শনা-জগতি রেললাইন দিয়ে তৎকালীন বাংলায় রেলযাত্রার সূচনা হলেও সাতক্ষীরা এতদিন সেই ইতিহাসের বাইরে ছিল। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ আমলে নাভারন হয়ে সাতক্ষীরা ও সুন্দরবন পর্যন্ত রেল সংযোগের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। দীর্ঘ দেড় শতাব্দী পর সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিতে চলেছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে এবং রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত ৪৪টি জেলা। সরকারের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন করে আরও ১৫টি জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনার বাস্তব উদাহরণ হিসেবেই নাভারন-সাতক্ষীরা-ভোমরা রেলপথ এগিয়ে চলেছে বাস্তবায়নের পথে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নাভারন হয়ে সাতক্ষীরা, ভবিষ্যতে মুন্সিগঞ্জ ও সুন্দরবন পর্যন্ত রেল সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই জনপদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।