আত্মজীবনীর আড়ালে বাংলাদেশের ইতিহাস

ফাতেমা ইয়াছমিন
ফাতেমা ইয়াছমিন  © টিডিসি ফটো

“একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।” -শেখ মুজিবুর রহমান

তুমি বাংলার ধ্রুবতারা
তুমি হৃদয়ের বাতিঘর
আকাশে বাতাসে বজ্রকণ্ঠ
তোমার কণ্ঠস্বর।
তোমার স্বপ্নে পথচলি আজো
চেতনায় মহীয়ান
মুজিব তোমার অমিত সাহসে
জেগে আছে কোটি প্রাণ।

বাঙালি জাতির ধ্রুবতারা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে; এখান থেকেই লাভ করেন বিএ ডিগ্রি। পঠিত বিষয় ছিল ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায়।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। শেখ মুজিব তার দল আওয়ামী লীগকে ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী করেন। তার ও তার দল আওয়ামী লীগের এই অর্জন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম প্রেক্ষাপট রচনা করে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি এক ঐতিহাসিক কালোতীর্ণ ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” পরবর্তীতে ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ স্বাধীনতার সেই অমোঘ ঘোষণা, তারপর তাকে রাষ্ট্রপতি মেনে মুজিবনগর সরকার গঠন ও মহান স্বাধীনতা অর্জন।

১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ১৯৭৫ সালে হন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দুঃখের বিষয় হলো- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের এই স্থপতি সপরিবারে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী উচ্চবিলাসী সদস্যের হাতে নিহত হন।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবর রহমানের আত্মকথন ও আত্মস্মৃতির এক লিখিত দলিল। শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ৪টি খাতা ২০০৪ সালে আকস্মিকভাবে তার কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলো অতি পুরনো পাতাগুলো জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট; মূল্যবান সেই খাতাগুলো পাঠ করে জানা গেল- এটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী; যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় লেখা শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেননি। তাই এটির নাম ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায়, “এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তার আত্মজীবনী লিখেছেন। ১৯৬৬-৬৯ সালে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি থাকাকালে একান্ত নিরিবিলি সময়ে তিনি লিখেছেন।”

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বর্ণিত হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট, লেখকের বংশ পরিচয়, জন্ম, শৈশব, স্কুল ও কলেজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্ভিক্ষ বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা দেশভাগ, কলকাতাকেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতি কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজী জুট মিলে বাঙালি ও বিহারি শ্রমিকদের মাঝে দাঙ্গা, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং এসব বিষয়ে লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

এতে আরও আছে লেখকের দীর্ঘ কারাজীবন পিতা-মাতা, রাজনৈতিক গুরু, সহকর্মী সন্তান-সন্ততি ও সর্বোপরি সর্বংসহা সহ-ধর্মিণীর কথা; যিনি তার রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সকল দুঃসময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। সেই সাথে লেখকের চীন, ভারত, পশ্চিম পাকিস্তান ও বার্মা (মিয়ানমার) সফরের বিস্তৃত ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ বইটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আত্মজীবনীর ভূমিকা রচনাকালে শেখ হাসিনার মন্তব্য, “আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময়গুলো কারাবন্দি হিসেবেই কাটাতে হয়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়েই তার জীবনে বারবার এই দুঃসহ নিঃসঙ্গ কারাজীবন নেমে আসে। তবে তিনি কখনও আপোষ করেন নাই।”

‘দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’ থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা আর সম্পাদনায় সাহায্য করেন বেবী মওদুদ, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, প্রফেসর এ এফ সালাউদ্দীন, শেখ রেহানা প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে ইংরেজি অনুবাদের কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ফকরুল আলম।

আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট

এই আত্মজীবনীর প্রারম্ভেই আমরা লেখককে বলতে শুনি- “বন্ধুবান্ধবরা বলে; তোমার জীবনী লেখ।” সহকর্মী বলে “রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাগুলি লিখে রাখ ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।” আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, “বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।”

কিন্তু তিনি সবসময়ই ভাবতেন, জনগণের জন্য সামান্য ত্যাগ স্বীকার করা ছাড়া তো তিনি জীবনে এমন কিছু করেননি; যা জেনে জনগণের কাজে লাগবে। কিন্তু পরোক্ষণেই ভাবলেন তার রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা, যার আদর্শে চিন্তা-ভাবনায় ও ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হয়ে রাজনৈতিক চর্চা শুরু করেছিলেন।

লেখকের ভাষায়, “ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা, কেমন করে তার সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কীভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।”  মূলত সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নিকটতম সান্নিধ্য ও স্নেহের কথা জানাতে গিয়েই এই আত্মজীবনী।

বংশ পরিচয়, জন্ম ও শৈশব

আত্মজীবনীর শুরুতেই লেখকের জন্ম, বংশ পরিচয় ও পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে নানা ইতিহাস ও তথ্য পাওয়া যায়, শেখ বংশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য পাঠককে নিঃসন্দেহে অভিভূত করবে।

লেখক বলেন, “আমার জন্ম হয় ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। আমার ইউনিয়ন হল ফরিদপুর জেলার দক্ষিণ অঞ্চলের সর্বশেষ ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের পাশেই মধুমতি নদী। মধুমতী খুলনা ও ফরিদপুর জেলাকে ভাগ করে রেখেছে।” লেখক আরও জানান, “টুঙ্গিপাড়ায় শেখ বংশের নাম কিছুটা এতদঞ্চলে পরিচিত। আমার জন্ম হয় এই টুঙ্গিপাড়া শেখ বংশে।”

লেখকের পূর্বপুরুষ শেখ বোরহান উদ্দিন কীভাবে এই অঞ্চলে এলেন এবং তার পরবর্তী বংশধররা কীভাবে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন; তার বিস্তৃত বর্ণনা এতে রয়েছে। এই বংশের শেখ কুদরতউল্লাহ ও শেখ একরামউল্লাহ এই দুই ভাই-ই মূলত বর্তমান শেখ বংশের নিকটতম পূর্বপুরুষ। এই দুই ভাইয়ের সময় শেখ বংশ নানা প্রতিপত্তি লাভ করে।

দেশের চারণকবিদের কাছ থেকে গানের মাধ্যমে তাদের অর্থ সম্পদ ও আভিজাত্যের কথা আজও জানা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, “ইংরেজ কুঠিয়াল মি. রাইন ও কুদরত উল্লাহ শেখের আধা পয়সায় জরিমানার গল্প।” শেখ বংশের পতন শুরু হয় মূলত রানী রাসমণি ও পুরানো প্রতিবেশী কাজী বংশের সঙ্গে কলহের কারণে।

শিক্ষাজীবন ও সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত

১৯৭২ সালের গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষাজীবনেরর সূত্রপাত ঘটে। এরপর ১৯২৯ হতে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে তাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে হয়। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ ও মাথুরানাথ মিশনারি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং ১৯৩৯ সালে এই বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে।

উল্লেখ্য, এটা ছিল ব্রিটিশ ভারতের স্বদেশী আন্দোলনের সময়কাল। গৃহশিক্ষক আবদুল হামিদের সাহচার্যে গরিব ও অসহায় ছাত্রদের সাহায্যের জন্য ‘মুসলিম সেবা সমিতি’ পরিচালনা করেন। ১৯৩৮ সালে উপমহাদেশের দুই রাজনৈতিক প্রবাদপুরুষ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে প্রথমবার পরিচয় ঘটে। এরপর ১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স পাস এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজ) হতে আইএ পাস করেন।

লেখকের ভাষ্যমতে- “এই সময়ে ইসলামিয়া কলেজে আমি খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছি। ইসলামিয়া কলেজই ছিল বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র।”

বিএ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ইসলামিয়া কলেজ হতে। তার পিতা শেখ লুৎফর রহমানের আগ্রহে দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। মূলত কলকাতার ইসলামিয়া কলেজেই ছিল তার রাজনৈতিক চর্চার সূতিকাগার; এখান থেকেই তিনি নিজেকে একজন আদর্শ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তৈরি করতে থাকেন।

দেশভাগ-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা

১৯৪৩ সালে বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা ইতিহাসে পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বয়ানে এই দুর্ভিক্ষপীড়িত সময়ে ব্রিটিশদের অপশাসন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় সিভিল সাপ্লাই দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে অবদান, দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য খাদ্য সহায়তা ও লঙ্গরখানা পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে।

প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ; সেই সাথে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সম্মেলন উপলক্ষে দিল্লি গমন করেন এবং দিল্লির লালকেল্লা, দেওয়ানি আম, দেওয়ানি খাস, কতুব মিনার ও নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ পরিদর্শন করেন।

এ সময় দ্বিজাতিতত্ত্বের বাস্তবতা প্রকাশ পায় এবং লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়ায়। ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা ও কলকাতা বিহার ও নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত; যার ভয়াবহ বর্ণনা লেখক আলোকপাত করেছে।

লেখকের ভাষায়, “জিন্নাহ সাহেব ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করলেন। ব্রিটিশ সরকারে ও ক্যাবিনেট মিশনকে তিনি এটা দেখাতে চেয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষের দশ কোটি মুসলমান পাকিস্তান দাবি আদায় করতে বদ্ধপরিকর।”

১৯৪৭ সালের ব্রিটিশরত কর্তৃক ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পাশাপাশি বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্তির ঘোষণা এবং ১৯৪৬ এর নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে সরিয়ে খাজা নাজিমুদ্দীনকে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত এবং মুসলিম লীগের নোংরা রাজনীতির আলেখ্য উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে নইমুদ্দীনকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন; যার প্রত্যক্ষ ভূমিকায় ছিলেন লেখক নিজে।

২১ মার্চ ১৯৪৮ জিন্নাহর উর্দুতে পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন। মূলত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক মোড় ঘুরতে শুরু করে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

২৩ জুন ১৯৪৯ ঢাকার রোজ গার্ডেনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। কারাবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিব হন এর যুগ্ম সম্পাদক। আরমানিটোলায় ভাসানীর নেতৃত্বে ভুখামিছিলে অংশগ্রহণ ও শেখ মুজিবের পুলিশের চোখ এড়িয়ে পশ্চিম পাকিস্তান গমন। এখানে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও লাহোর করাচি ও পাঞ্জাব ভ্রমণের বর্ণনা পাওয়া যায়।

একপর্যায়ে তিনি বাঙালি ও পাঞ্জাবিদের তুলনা করে বলেন, “প্রকৃতির সাথে মানুষের মনেরও একটা সম্বন্ধ আছে। বালুর দেশের মানুষের মনও বালুর মত উড়ে যায়। আর পলিমাটির বাংলায় মানুষের মন এ রকমই নরম এ রকম সবুজ।”

পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক শাসন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও যুক্তফ্রন্ট গঠন

লেখক পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতি ও মুসলিম লীগের অপশাসনের উল্লেখ করে বলেন, “মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই। জমিদার জোতদার ও খান বাহাদুর নবাবদের প্রতিষ্ঠান ছিল।”

যে উদ্দেশ্যে জনগণ পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তা ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়, এরই প্রেক্ষিতে ৪টি দল নিয়ে ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠিত হয়। এই সময়ে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল হন গোলাম মোহাম্মদ ও প্রধানমন্ত্রী হন মোহাম্মদ আলী (বগুড়া)। মূলত তখন থেকেই পাকিস্তান রাজনীতিতে আমলাতন্ত্রের শাসন শুরু হয়।

আদমজী জুট মিলে দাঙ্গা ও ২৯ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সরকার কর্তৃক বাতিল ঘোষণা; বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীর দুটি স্থানে এই কথা সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, “আমলাতন্ত্র মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর সাথে সাথে মাথাচড়া দিয়ে উঠেছিল। তারপর আমলাতন্ত্রের প্রকাশ্য খেলা শুরু হল পাকিস্তানের রাজনীতিতে।”

এরপর আর তার লেখা আর বেশিদূর এগোয়নি। তিনি পূর্ব বাংলার নেতাদের প্রতি আর আস্থা স্থাপন না করে বরং আক্ষেপ করেই বলেছেন: “কোথায় গেল একুশ দফা, আর কোথায় গেল জনতার রায়।”

এর বাইরেও তিনি ১৯৫২ সালে পিকিং বিশ্ব শান্তি সম্মেলন নিয়ে তার চীন সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। রয়েছে দীর্ঘ কারাজীবনের ঘটনাপ্রবাহ, ব্যক্তিজীবন এবং সহধর্মিণী ও ছেলে-মেয়ের কথাও।

মূল্যায়ন

তথ্যবহুল ও গবেষণাধর্মী এই আত্মজীবনী মূলত বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক জীবন্ত দলিল। এতে বাঙালি জাতির অভ্যুদয়ের ইতিহাস স্বাধিকার আন্দোলন ও সর্বোপরি উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আলোকপাত রয়েছে।

এটি একটি নিরীক্ষাধর্মী গ্রন্থ; যেখানে পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের ক্রমধারা বর্ণিত হয়েছে লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখনীর মাধ্যমে। তাই এটিকে শুধু একজন দেশপ্রেমী মহান নেতার আত্মজীবনী হিসেবে বিবেচনা না করে বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করাই অধিক বিবেচ্য ও যুক্তিসংগত। পরবর্তী প্রজন্মকে বিভিন্ন অর্থেই এই আত্মজীবনীটি দেশসেবায় ব্রতী করতে অনুপ্রাণিত করবে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

x