০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:৪১

কৃষির উন্নয়নে দরকার কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষক সিন্ডিকেট

  © ফাইল ফটো

কৃষকের প্রাণ খোলা হাসি তো একটা জাতির হাসি। প্রতিনিয়ত যেমন কৃষকের পবিত্র পায়ের ছোঁয়ায় উর্বর হয়ে ওঠে বাংলার কৃষি জমি ঠিক তারই ধারাবাহিকতায় কৃষকের শরীরের ঘামের ফোঁটাকে জ্বালানি ধরে এগিয়ে চলছে আমাদের অর্থনীতির চাকা। কৃষির উৎপাদন ভালো হলে জাতীয় অর্থনীতি যেমন হয়ে ওঠে সবল ও সমৃদ্ধ ঠিক তেমনি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশে নেমে আসে অভাব ও দুর্যোগ।

আমাদের দেশের সিংহভাগ কৃষক দরিদ্র হওয়ায় তারা ফসল ফলানোর জন্য ঋণ নেয় সুদী-মহাজন, অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান এনজিও গুলোর কাছ থেকে। ঋণ নিয়ে ফসল ফলানোর দরুণ ন্যায্য মূল্যের অভাবে ঋণ পরিশোধ না করতে পারায় ঋণগ্রস্ত হতে হতে অন্য উপায় না পেয়ে এক পর্যায়ে একমাত্র সম্বল কৃষি জমিটুকু বিক্রি করে ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হয়। এরাই আবার হয়তো বর্গাচাষী হয়, নয়তো ভাগ্যান্বেষণে শহরে পাড়ি জমিয়ে গার্মেন্টস কিংবা বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। এভাবে মানুষ ধীরে ধীরে কৃষির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। ১৯৮৩-৮৪ সালের শুমারিতে দেখা যায়, গ্রামীণ পরিবার গুলোর মধ্যে ৭২.৭০ শতাংশ কৃষির সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে এসে এর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৬.৭৪ শতাংশে। স্বাভাবিকভাবেই বর্তমানের সংখ্যা আরো নিম্নগামী হবে বলেই ধারণা করা হয়।

অপরদিকে অপরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং আবাসন গড়ে উঠায় আবাদি কৃষি জমির পরিমাণ দিনের পর দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ক্রমশই হুমকির মুখে পড়ছে এদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ।কৃষি প্রধান দেশ হওয়ায় কৃষি এবং কৃষকের সমস্যাই মূলত আমাদের জাতীয় সমস্যা। কিন্তু আমাদের দেশের নীতি-নির্ধারকদের দ্বারা এই খাতটি দিনের পর দিন উপেক্ষিত থাকছে। সরকার হয়তবা কৃষি খাতকে তরান্বিত করার জন্য বিনামূল্যে সার, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, রোগ মুক্ত বীজ সরবরাহ করার চেষ্টা করছে কিন্তু অব্যবস্থাপনার বেড়াজাল থেকে কোন ভাবেই বের হতে পারছে না কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা।

কৃষির বাজার ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাক ভর্তি করে আসা পণ্য বিক্রি করতে হয় স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে। এর জন্য দালালদের কমিশনও দিতে হয়। কমিশনের টাকা ব্যাপারীরা তুলে নেয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে। খুচরা বিক্রেতারা ওই দামের ওপর ৮-১০ টাকা মুনাফা ধরে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে।

বেশ-কিছুদিন আগেই যখন দেশের উত্তপ্ত সবজি বাজার ঘামিয়ে তুলেছিল সাধারণ ক্রেতাদের। ঠিক সেই সময় ওই উত্তাপে হাসতে পারেননি এদেশের সবজি উৎপাদনকারী প্রান্তিক কৃষকরা। সবজি চাষের প্রধান প্রধান এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য এবং রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে উৎপাদন ও খুচরা পর্যায়ের দামের মধ্যে দেখা যায় বিস্তর ফারাক। ক্রেতাদের কাছে নানা অজুহাতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতারা পকেট কাটলেও ন্যায্য দাম থেকে বরাবরই বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকরা।

আড়তদারসহ বিভিন্ন মধ্য স্বত্বভোগী সকলেই অধিক মুনাফা লোভী। যার ফলে কৃষক যেমন তার ন্যায্য দাম পাচ্ছে না ঠিক একই ভাবে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ ক্রেতারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নতুন নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও কৃষি বিপণি কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতা এবং কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে পারদর্শী এমন লোকবলের অভাবই এই সমস্যার উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো. মিজানুল হক কাজল।

দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে রাজপথে নামে জনগণ, ব্যবসায়ীদের দাবী আদায়ে তো অনেক আগে থেকেই গড়ে উঠেছে নানা ব্যবসায়ী সংগঠন, এদিকে মাঠ পর্যায়ে পাইকার এবং ফড়িয়াদের রয়েছে শক্ত সিন্ডিকেট। কিন্তু বাংলার কৃষকদের, না আছে তাদের কোন সিন্ডিকেট না আছে তাদের দাবী আদায়ে কার্যকারী কোন সংগঠন। যার ফলশ্রুতিতে মধ্য স্বত্বভোগীদের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে মাটিতে সোনা ফলানো এই প্রান্তিক কৃষকরা।

কৃষি পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণ এবং কৃষিকে ভবিষ্যৎতে আরো তরান্বিত করার পরামর্শ হিসেবে ড. কাজল বলেন, ‘সরকারের সঠিক বাজার পর্যবেক্ষণ, ক্রেতা বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয় এবং কৃষি বিপণিতে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতক অর্জনকারীদের নিয়োগ যেমন সুনিশ্চিত করতে হবে ঠিক তারই সাথে প্রান্তিক পর্যায়ে গড়ে তুলতে হবে কৃষক সিন্ডিকেট। তা না হলে দেশের সাধারণ জনগন যেমন দুর্ভোগে পড়বে ঠিক তেমনি অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে দেশের কৃষি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।