ঢাবির বি ও সি ইউনিটে শততম নুহা—জাবি ও শাবিতে পজিশন ৫০-এর নিচে
এমন কিছু গল্প থাকে যা মন খারাপ করিয়ে দেয়, আবার আশার আলোও দেখায়। গল্পটা শোনার পর মনে হয়, এইতো জীবন। যে পরিস্থিতি আসুক, থেমে থাকা যাবে না। এমনই এক গল্পের নাম ‘নুহা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ সেশনের বি (কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিট) ও সি (ব্যবসায় শিক্ষা) ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ১০০তম স্থান অধিকার করেছেন তিনি। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগে ৩২তম, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৭তম স্থান লাভ করেছেন।
তবে নুহার (পুরো নাম নুসরাত জাহান নুহা) গল্পের শুরুটা আজ থেকে প্রায় ৫ বছর আগে। ৮ম শ্রেণি থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ক্যান্সার “অস্টিওসারকোমা”-এর সঙ্গে লড়াই করছেন তিনি। নুহার ভাইয়ের ভাষায় গল্পটার শুরুটা ছিলো এমন- একসময় সাইকেল চালাতো, গাছে উঠতো আবার হঠাৎ করেই সব থমকে গিয়েছিল সেই সময়টায় ঠিক যেন নচিকেতার "যখন সময় থমকে দাঁড়ায়" গানের মতো! এত কিছুর পরও থেমে থাকিনি নুহা। এসএসসিতে জিপিএ -৫ পেল আর এইসএসসিতে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে বোর্ডে ১৭তম হয়ে ট্যালেন্টপুলে স্কলারশিপ। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা নুহার।
সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নুহার গল্প জানিয়েছেন বড় ভাই খালিদ। পোস্টে তিনি এও জানিয়েছেন, নুহা কারো সিম্প্যাথি নিতে চায় না, খুব শক্ত আমার-আপনাদের বোন। তাই তিনি কথা দিয়েছেন চেষ্টা করবেন নুহার সংগ্রামের গল্প আর না শোনাতে। এছাড়াও নুহার জন্য দোয়া চেয়ে খালিদ লেখেন, ‘নুহা শুধু আমার বোন না সে আপনাদেরও বোন, ওর জন্য আপনারা দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন সারাজীবন তাকে সুস্থ রাখেন আর আপনাদের উপকারে নিজেকে নিবেদন করতে পারে।
জানতে চাইলে খালিদ মাহমুদ আজ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নুহার জার্নিটা অনেক কঠিন ছিলো। ওই সময়গুলো আমাদের পরিবারের জন্য অনেক কঠিন ছিলো। নুহার কথামতো আমি ওই সময়গুলো ভুলে যেতে চাই।
নুহার চিকিৎসার সময়ের কথা জানিয়ে খালিদ মাহমুদ ফেসবুকের পোস্টে লেখেন, এমনও হয়েছিল নুহার কেমোথেরাপির দেওয়ার এক পর্যায়ে এসে তার আর ভেইন পাওয়া যাচ্ছিলো না ক্যানোলা করার জন্য আর কেমোথেরাপির দিনগুলোতে তার মাথা স্বাভাবিকভাবেই ন্যাড়া করতে হয়েছিল, শখের চুল আর দেখে কে তখন, কি অসহনীয় চিৎকার ৮ম শ্রেণির একটি মেয়ের, আমরা কীভাবে সহ্য করেছি জানি না।
তিনি আরও লেখেন, বোনটা আমার কীভাবে যে দিনগুলো কাটিয়েছিলো আল্লাহ পাকই জানেন, আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যখন ডাক্তার বললেন, ওর পা কেটে ফেলা সেইফ তখন আমরা ভাবছি ১৫ বছরের একটা মেয়ের পা কেটে ফেলতে বলছে! কিন্তু পরবর্তীতে আলোচনা করে ‘রাইট টাইবা’ (হাড়) কেটে ফেলে সেখানে একটি ১০০ বছর জন্য একটি প্রস্থেটিক ডিভাইস বসানো হয় এবং ঐ পা আর কোনোদিন বড় হবে না এবং কোনোদিন খারাপভাবে পড়ে গেলে আজীবন হুইল চেয়ারড, ভয়ানক কষ্ট হয় সেদিন যেদিন দেখি এই একই ধরনের ক্যান্সার নিয়ে একটি নুহার বয়সী মেয়ে তার পা কেটে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ভুল চিকিৎসায়....
খালিদ লেখেন, যা হোক এত বড় পড়াশোনার গ্যাপ সামলে, ক্যান্সারের কারণে বিভিন্ন অসুস্থতার পরেও শত শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় নুহা এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে যায় নুহা, মনে হয় আল্লাহপাক তার ধৈর্য আর পড়াশোনা দেখে খুশি হয়েছিলেন আর তাকে তাই উপহার দিয়েছিলেন এবং এরপর আমার বড় বোন মণির আপুর আগ্রহের কারণে কয়েকদিন পড়াশোনা করেই নুহা হলিক্রস কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়, বলা বাহুল্য, আমাদের পারিবারিক ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন ইব্রাহিম খলিল স্যার যিনি আমাদের সবাইকে আগলে রাখতেন, ভালোবাসতেন তিনি খুব চেয়েছিলেন নুহা হলিক্রসে পড়ুক কিন্তু ওর তো ভাগ্য খারাপ, চ্যান্স পেলেও বিল্ডিং এর তিন তলায় ক্লাস হবার কারণে সে ভর্তি হতে পারলো না কারণ সে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে না, তার একটা পা ছোট আর জোড় নেই শরীরে, ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটতে হয়, হলিক্রসের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না তাই পঞ্চগড়ে গিয়ে পিছিয়ে পড়ে নতুন শুরু তার, কে জানতো সেই পিছিয়ে পড়েই এগিয়ে যাবার ক্ষুধা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে বোর্ডে ১৭তম পজিশন পেল!
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং আর ভর্তি পরীক্ষার কঠিন সময়ের কথা জানিয়ে খালিদ লেখেন, তার (নুহা) ইচ্ছা ভাইয়া আমি অফলাইনে কোচিং করবো, কিন্তু কোচিং ফার্মগেটের হলিক্রসের পাশে যেখানে যেতে হলে কিছুটা রাস্তা হাঁটতে হবে আর মোহাম্মদপুরে ভর্তি হলে তিনতলায় উঠতে হবে, কি করা! ভর্তি করলাম ফোকাসের অনলাইন ব্যাচে! পড়াশোনা করছিল এদিকে আম্মাও প্রায় হুইলচেয়ারড, যাকগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওর স্বপ্ন, কিন্তু সি ইউনিটের পরীক্ষার আগের রাতে নুহা হাসপাতালে, কি করার সে নাকি পরীক্ষা দিবেই, এবং রেজাল্ট আসলো ১০০তম হলো, আর এরপর থেকে নুহার জ্বর, ১০টা দিন সেভাবেই আর পড়াশোনা না করেই পরীক্ষা দিলো বি (মানবিক) ইউনিটে! ওহ আচ্ছা এর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ৩২তম হয়েছে, আম্মা বলছিল, হইছে বাপ! পরবর্তীতে এইতো সেদিন বি ইউনিটে ১০০তম হলো আল্লাহর ইচ্ছায়, যদিও পরীক্ষা দিয়ে তার মন খারাপই ছিলো কিন্তু পরে শুনি সবারই পরীক্ষা এরকমই হয়েছে, তাই বলছিল হতে পারে, আল্লাহ ভরসা। এইতো তাই, এখন আমি আপনাদের তার গল্প শোনাচ্ছি, আর আপনারা অবাক হচ্ছেন তাই না! নুহা আপনাদের বোন ওকে দোয়ায় রাখবেন প্লিজ। ও হ্যাঁ গতকাল রাতে শাবিপ্রবিতে (শাহাজালাল বিজ্হান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) নুহা ৪৭তম হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, আর জগন্নাথে পরীক্ষা দিয়েছিল ফলাফল প্রকাশ হয় নি, তবে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হবে কারণ এটাই ওর শেষ স্বপ্ন। আর আবারও স্বপ্ন ছিলো আমাদের কেউ "আইন" বিষয়ে পড়বে, দেখা যাক নসিবে কি রেখেছেন আল্লাহ পাক!
এখন নুহার শরীরে ক্যান্সার সেল নেই জানিয়ে খালিদ লেখেন, নুহার হয়ত এখন আবৃত্তি, গান আর কবিতা লেখার জায়গাটা আরও বড় হলো, সমৃদ্ধ হলো। আর হ্যাঁ, ছোটবোনরা আল্লাহর উপহার, ভালোবাসা। তবে আমি এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শুনেছি - মান্নাদের "সে আমার আদরের ছোটবোন" গানটি। আপনিও শুনতে পারেন, ভালোবাসা চোখ গড়িয়ে পড়বে। এখন ওর শরীরে ক্যান্সার সেল নেই আলহামদুলিল্লাহ। দোয়ায় রাখবেন ক্যান্সার যেন শত্রুরও না হয়, আর কোনোদিন দেখা না দেয়.. কিন্তু আপনারা নুহাকে অবশ্যই দেখা দেবেন ভালোবেসে, আদর করে মা বলে ডেকে, বোন বলে ডেকে।
খালিদের ভাষ্যমতে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে আল্লাহ আপনাকে যে জায়গায় পৌঁছে দেবেন, তা আপনি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবেন না। কারণ উনি তাকিয়ে থাকেন আমাদের পানে।