বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা: মানতে ও জানতে হবে যেসব বিষয়
সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম চলছে। সব অভিভাবকই চান, তাঁদের সন্তানেরা কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক। কিন্তু এটা অনেকের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে এ সময়ে সন্তানদের ভর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন অভিভাবকেরা। থাকারই তো কথা। প্রত্যেকেই চান, তাঁর সন্তান সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোক। কিন্তু দেশে এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি।
এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দরকার সঠিক পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী কঠিন অধ্যাবসায়। এ জন্য ভর্তি পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করব; যা তোমাদের এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে পাথেও হবে বলে মনে করি।
প্রথমত, যেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, লক্ষ্য নির্ধারণ করা। কারণ লক্ষ্যহীন মানুষ ড্রাইভার ছাড়া বাসের মতো। তাই কোনো কিছু করার আগে পরিকল্পনা নাও। কারণ একটি ভালো পরিকল্পনা মূলত কাজের অর্ধেক। তাই প্রথমেই দরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। তাই তোমার ভালো লাগার ক্ষেত্রটা আবিষ্কার করো।
মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, অর্থনীতি, গণিত কিংবা পদার্থবিজ্ঞান, ইসলামিক স্টাডিজ- কোন ক্ষেত্রে তোমার আগ্রহ রয়েছে, তা ভেবে দেখো। সেই পথেই অগ্রসর হও। সেই বিষয়ে পড়ার সুযোগ অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নাও। তবে যে কথাটি না বললেই নয় তা হলো, তোমার স্বপ্ন যেন কখনোই কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক না হয়ে বরং বিষয়কেন্দ্রিক হয়।
যেমন, এমন অনেকেই আছে যার কেবল বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন। অথচ সে কখনোই ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। আসলে এটা স্বপ্ন নয়, এটা হচ্ছে একটা মোহ। সেই সব শিক্ষার্থীর পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার চাপ সামলাতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে নানান সমস্যায় পড়তে হয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকতেই পারে। তবে সেটির আগে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে 'বিষয়’-কে।
দ্বিতীয়ত, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষার আগে সাধারণত প্রায় চার মাস সময় হাতে পায়। কিন্তু করোনার কারণে দীর্ঘ দু-বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এখন একটু বেশি সময় পাওয়া যায়। তবে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠলে ৪-৫ মাসের বেশি সময় পাওয়া যাবে না। এই সময় একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
আরো পড়ুন; রাবি ভর্তিচ্ছুদের জন্য ট্রেনে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা রেলওয়ের
এই সময়টাতে প্রচুর পড়াশোনা ও সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করলে তবেই আসতে পারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। অন্যসব সময়সাপেক্ষ কাজ-কর্ম (ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি) বর্জন করতে হবে। অনেকেই প্রশ্ন করে ‘ভর্তি পরীক্ষার আগে দৈনিক কত ঘণ্টা পড়ব?’ এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। এটি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার।
আসলে একটা বিষয় বা Concept পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে তোমার যতক্ষণ সময় লাগে ততটুকু তোমার দেওয়া উচিৎ। এর কোন সময়সীমা থাকা উচিত না। তবে কথা হচ্ছে, যতক্ষণ না তুমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারবে যে তুমি চান্স পাওয়ার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছ, ততক্ষণ পর্যন্ত পড়তেই হবে। ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। সব অধ্যায়ই পড়তে হবে।
তবে বিগত বছরের প্রশ্ন দেখে অধ্যায়ের গুরুত্ব জানা যাবে। এ ব্যাপারটি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক। অর্থাৎ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রশ্নে যে অধ্যায় থেকে সচরাচর প্রশ্ন কম আসে তা কেবল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে ওই ভার্সিটির জন্য কোন অধ্যায় বা টপিক গুরুত্বপূর্ণ।
পড়ার পাশাপাশি প্রচুর প্রশ্ন সমাধান অনুশীলন করতে হবে। এর দ্বারা পড়া আরও ঝালাই হবে। প্রশ্নের সঙ্গে পরিচিতি হবে এবং প্রশ্ন দেখার পর উত্তর মাথায় আনার দক্ষতা অর্জিত হবে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য মূল পাঠ্যবই খুব ভালোভাবে পড়তে হবে। সব প্রশ্ন একদম বই থেকেই হয় তাই মূল বইয়ের আগে কোনো কিছুকে প্রাধান্য দিলে চলবে না।
ইঞ্জিনিয়ারিং ও লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রথমত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিতের ব্যাসিক শক্তিশালী হতে হবে। এরপর প্রচুর গাণিতিক সমস্যা সমাধানের অনুশীলন করতে হবে। আর যারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্ব অনুষদে পরীক্ষা দিবে তাদের জন্য, আল-কুরআন, আল-হাদিস, আরবি, দা’ওয়াহ এই চারটি হলো বুলেট সাবজেক্ট। কারণ এ চারটির ওপরই ভর্তি পরীক্ষায় বেশি নম্বর। তাই এ বিষয়গুলা ভালোভাবে অনুশীলন করতে হবে।
তৃতীয়ত, তোমাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় মনোবল রাখতে হবে। কখনও হতাশ হওয়া যাবে না। সবসময় মনে রাখতে হবে, আল্লাহ বলেছেন 'লা তাহযান ইন্নাল্লাহা মা আনা' অর্থাৎ বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। ভর্তি পরীক্ষার আগের চার মাস তুমি পদে পদে হোঁচট খাবে। বারবার মনে হবে যে তোমাকে দিয়ে হবে না। ভর্তি কোচিং-এর পরীক্ষা কোনোটা ভালো হবে আবার কোনোটা খুব খারাপ হবে।
এ স্রোতের ওঠানামার সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন। মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখাটা খুব কঠিন। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। ‘আমি পারবো’ আর ‘আমি পারবোই’ এর মধ্যে তফাৎ আছে। বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলা হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। আর চেষ্টা করি বা না করি আমি পারবোই- এ ধরনের মানসিকতা হচ্ছে ‘ওভার কনফিডেন্স’ যা মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয় এনে দেয়।
এই চার মাস দেখবে অন্যের প্রাপ্ত নম্বর দেখে হতাশ লাগবে। প্রাপ্ত সর্বোচ্চ নম্বর দেখে নিজেকে তুচ্ছ মনে হবে, কিন্তু লড়াইটা করতে হবে নিজের সঙ্গে। আলহামদুলিল্লাহ্ বলতে শেখ। যখন যে নম্বরই পাওনা কেন, আলহামদুলিল্লাহ্ বলবে এবং মন থেকে। কারণ তুমি আজ পরীক্ষায় ফেল করেছ, কিন্তু তুমি তো সুস্থ আছ, বেঁচে আছ। এই তো অনেক। প্রতিযোগিতা করবে না। প্রতিযোগিতা করবে শুধু নিজের সঙ্গে। চেষ্টা করবে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে। কালকে কি হবে এটা ভেবে দিন পার করো না।
চতুর্থত, চেষ্টা করবে যত বেশি সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব, তা দেবে। অনেকেই মনে মনে নির্বাচন করে ওমুক বিশ্ববিদ্যালয় আমার ভালো লাগে না, ওমুক বিশ্ববিদ্যালয় দূরে, এতদূর যেতে আলসেমি লাগে, পরীক্ষাই দেব না ইত্যাদি। এসমস্ত চিন্তা মাথা থেকে এখনই ঝেড়ে ফেলো। কারণ ভর্তি পরীক্ষার চিত্রটা তোমার কল্পনার বাইরে। তুমি যত ভালো শিক্ষার্থী হও না কেন, অন্তত এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেই ছোট করে দেখবে না। কারণ ভর্তি পরীক্ষায় একটা বিরাট ভূমিকা রাখে ভাগ্য।
আরো পড়ুন: রাবির পরীক্ষায় বিশেষ কোটায় সুযোগ পাবেন ৬২১ জন
তাই সবসময় আল্লাহর উপর ভরসা করে ভর্তি আবেদন করার ক্ষেত্রে বাছবিচার না করে সবখানে পরীক্ষা দাও। আর এ সময় প্রচণ্ড মানসিক চাপের এই সময়টাতে মাথা ঠিকঠাক কাজ করে না, অনেক কিছুই ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। এমন ঘটনা অহরহ ঘটে যে, কোনো ভার্সিটির ভর্তি বিজ্ঞপ্তি কবে দিল, কিংবা কবে আবেদনের শেষ তারিখ চলে গেল খেয়ালই করলে না।
আবার এমনও ঘটতে দেখা যায় যে ফর্ম পূরণ করেছে অথচ টাকা জমা দেব দেব করে আর দিতে মনে নেই। ফলে পরীক্ষাই দেওয়া হয় না সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এত কষ্ট করে প্রস্তুতি নিচ্ছো, যদি এভাবে পরীক্ষাই দিতে না পারো তাহলে তো সেটা মেনে নেয়ার মতো না। আমার খুব করে মনে আছে, আমার কলেজের এক ছোট ভাই, ও অনেক বেশি মেধাবী ছিল; সবাই বলত ওর ঢাবিতে শিওর চান্স হবে। ওভার কনফিডেন্স ছিল, তাই শুধু ঢাবি আর জগন্নাথে আবেদন করেছিল, পরে তার শুধু জগন্নাথে একটা নর্মাল সাবজেক্টে চান্স হয়েছে।
আমাকে এসে বলেছিল ভাই; সত্যিই ভুল করেছি, যদি আরও কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতাম তাহলে হয়তো, ভালো একটা সাবজেক্টে গ্রাজুয়েশন শেষ করতে পারতাম। সুতরাং, এসব ভুল থেকে সাবধান থাকতে হবে। সব খোঁজ খবর রেখে ঠিকঠাক ভর্তি আবেদনের দায়িত্বটা তোমারই নিতে হবে।
পঞ্চমত, প্রশ্ন ও খাতা পাওয়ার পর সব নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে পড়ে নিতে হবে, যাতে কোনো ভুল না হয়। প্রশ্ন কিংবা খাতায় কোনো ত্রুটি থাকলে তা জরুরিভিত্তিতে কক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জানাতে হবে এবং ত্রুটিযুক্ত খাতা কিংবা প্রশ্ন পরিবর্তন করে নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ছেঁড়া খাতা কিংবা ঝাপসা প্রশ্ন। খুব বড় ধরনের সমস্যা না হলে প্রশ্ন বা উত্তরপত্র পরিবর্তনের কোনো দরকার নেই। নিজের নাম, রোল, সেটসহ প্রতিটি তথ্য খুব মনোযোগ দিয়ে পূরণ করতে হবে।
এখানে একটি তথ্য ভুল হয়ে গেলেই তোমার ফলাফল আসবে না। তাই এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে। পরীক্ষার হলে প্রয়োজনে পানি নিয়ে যেতে পারো। এটি তেমাকে অনেক ক্ষেত্রে চিন্তামুক্ত রাখবে। পরীক্ষায় কোনোভাবে অসদুপায় অবলম্বন করার চেষ্টা করবে না। এটি অনেক বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যাঁরা বাইরের বিভিন্ন শহর থেকে আসবে, তাঁরা ঘড়ি, মোবাইল পরীক্ষার কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে অথবা বাইরে হেল্প ডেস্কে জমা দেবে। প্রতিটি কক্ষে ঘড়ি থাকবে। আর যদি না থাকে, তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সময় জেনে নিতে হবে।
সময় ব্যবস্থাপনা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রশ্ন পাওয়ার পর তা মনোযোগ সহকারে এক থেকে দুইবার পুরো প্রশ্নটা পড়া উচিত। যে প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে বেশি ভালো জানা আছে, সেগুলো দিয়ে শুরু করা উচিত। বহুনির্বাচনী পরীক্ষার ক্ষেত্রে আন্দাজে প্রশ্নের উত্তর করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, নেগেটিভ নম্বরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না-ও মিলতে পারে। আত্মবিশ্বাস আছে, এমন প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে করে ফেলা উচিত।